অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তে কুষ্টিয়ার জেল সুপারসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী ফাঁসছেন

আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু,কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া কারাগারের নানা অনিয়মের তদন্তকরতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। ঐ কারাগারের বেশ কয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বড় ধরনের দুর্নীতির তথ্য পেয়ে জেল সুপারসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শান্তি দেওয়ার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে এই কমিটি। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের সাবেক জেলার এসএম মহিউদ্দিন হায়দারের নাম থাকায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কিন্তু তদন্ত শুরু হওয়ার বিশ মাস আগেই ওই কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে অন্য কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে মহিউদ্দিন হায়দারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করার কারণ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরেকটি তদন্ত কমিটি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কুষ্টিয়া কারাগারের সাবেক জেলার এসএম মহিউদ্দিন আহমেদের নাম কীভাবে এলো তা নিয়ে তদন্ত করা হবে।

কমিটি যখন তদন্ত করেছিল তার বিশ মাস আগেই তিনি অন্য কর্মস্থলে চলে গেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তার নামটি কীভাবে এলো তা খতিয়ে দেখা হবে। কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি পদোন্নতি পেয়ে নতুন কর্মস্থল বাগেরহাট জেলা কারাগারে সিনিয়র জেলার হিসেবে যোগ দেন এসএম মহিউদ্দিন হায়দার। গত বছরের নভেম্বর মাসে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের দুর্নীতি তদন্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন এবং উপ-সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত বছরের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে গিয়ে তদন্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবের কাছে একজন ডিআইজি এবং কয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগারের ক্যান্টিনের ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যরুš১৬ মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব নেই।

কারাগারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী এই ১৬ মাসে ক্যান্টিন থেকে আয় করেছে ৩৩ লাখ ১৭৪৩ টাকা। এই সময়ের মধ্যে ক্যান্টিনের পেছনে কারা র্কর্তৃপক্ষ ব্যয় করেছে ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৬৮ টাকা। অর্থাৎ ক্যান্টিন চালাতে গিয়ে কারা র্কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত খরচ করেছে। ক্যান্টিন পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী বন্দি ও কারারক্ষী কল্যাণে খরচ দেখানো হলেও বিল ভাউচার পরীক্ষা এবং বন্দি ও কারারক্ষীদের বক্তব্য অনুযায়ী মূলত তাদের কল্যাণে কোনো টাকা খরচ করা হয়নি। জেল সুপার নিজের ইচ্ছামতো ক্যান্টিনের লভ্যাংশ খরচ করেছেন। কারারক্ষী ও বন্দিদের কাছে জেলারের দায়িত্বে নিয়োজিত ডেপুটি জেলার আমিরুল ইসলামের কোনো গুরুত্বই নেই। সব কিছু জেল সুপার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

প্রত্যেক মাসে কারা ক্যান্টিনের লভ্যাংশের টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে খরচ দেখিয়ে জেল সুপার ও হিসাবরক্ষক কুক্ষিগত করেছেন। এ ক্ষেত্রে জেল সুপার জাকের হোসেন এবং হিসাবরক্ষক আজহার আলীর আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই ১৬ মাসে তাদের দায়িত্বকালে কষ্টিয়া জেলা কারাগারের খাদ্য হিসেবে সরবরাহকৃত সবজি, মাছ, মাংস ও ডাল নিম্নমানের ছিল। বন্দিদের নির্ধারিত ডায়েটস্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ খাবার সরবরাহ না করে বরাদ্দকৃত অর্থ তারা আত্মসাৎ করেছেন। কারাগারে আটক বন্দিদের নিকট থেকে বন্দি বেচাকেনা, সাক্ষাৎ ও জামিন বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, চিকিৎসা বাণিজ্য, পিসি বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য এবং কারাভ্যন্তরে মাদক প্রবেশ বাণিজ্যসহ সব অনিয়ম জানা সত্তেও নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হিসেবে জেল সুপার সেগুলো বন্ধ করেননি। জেল সুপার অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিমাসে বন্দিদের নিকট থেকে টাকা আদায়পূর্বক আদায়কৃত অর্থ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন।

কারাগারের ভেতর মধ্যযুগীয় কায়দায় বন্দিদের চোখ ও হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। বন্দিদের নির্যাতন চালানোর পেছনে পাঁচজন কারারক্ষীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এরা হলেন কারারক্ষী নুরুজ্জামান, সামসুল হক, মাহফুজুর রহমান, মজিবর রহমান ও তপন কুমার হাওলাদার। কারাগারের ভেতর মাদকসহ নিষিদ্ধ মালামাল প্রবেশ ও বিক্রির পেছনে জেল সুপারের নিয়ন্ত্রিত কারারক্ষীরাই এই কাজটি করে থাকেন। এরা হলেন দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, সহকারী প্রধান কারারক্ষী শরিফুল ইসলাম, গেট চাবি কারারক্ষী সাইদুল ইসলাম, কারারক্ষী বাদল হোসেন, ফারুক রহমানসহ আরও পাঁচ কারারক্ষী। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ : তদন্ত কমিটি যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তারা হলেন কারারক্ষী আবু সাইদ, কারারক্ষী (অর্ডারলি) জিয়াউর রহমান, খাদ্য গুদাম সহকারী মনিরুজ্জামান, কারারক্ষী (ভর্তি শাখা) মাহাবুবর রহমান, মামুন হোসেন-১, কারারক্ষী (উৎপাদন শাখা) সোহেল রানা, কারারক্ষী (গেট অর্ডার) দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, গেট চাবি কারারক্ষী সাইদুল ইসলাম, বাদল হোসেন, ফারুক আহম্মেদ, ডিউটি বন্ঠনকারী কারারক্ষী মজিবার রহমান, সহকারী প্রধান কারারক্ষী শরিফুল ইসলাম, কারারক্ষী আনিচুর রহমান, হারুন অর রশিদ, মাসুদ রানা, আরিফুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, আশিকুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম, মামুন হোসেন-২, জসিম উদ্দিন, আমিরুল ইসলাম, আফছার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম রেজা, নুরুজ্জামান, সামসুল হক, মাহফুজুর রহমান, প্রধান কারারক্ষী শফিকুল ইসলাম, মজিবর রহমান, তপন কুমার হালদার, হিসাব রক্ষক আজহার আলী, প্রাাক্তন জেলার এসএম মহিউদ্দিন হায়দার এবং জেল সুপার জাকের হোসেন।

এদেরকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করেছে তদরুšকমিটি। এর পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার কারণে যশোর বিভাগীয় ডিআইজির বিরুদ্ধে বিধিগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদরুšকমিটির এই তদন্ত চলাকালে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের সাবেক জেলার এসএম মহিউদ্দিন হায়দার বাগেরহাট জেলা কারাগারের সিনিয়র জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ব্যাপারে বাগেরহাট জেলা কারাগারের সিনিয়র জেলার এসএম মহিউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘২০১৬ সালের ৫ জুন থেকে ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আমি কুষ্টিয়া কারাগারের জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমার দায়িত্ব পালনের পর তদরুšকমিটির তদস্ত চলাকাল পর্যরুšআরও চারজন জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যে সময়ে দুর্নীতি নিয়ে তদরুšকরা হয়েছেওই সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ আমি বুঝতে পারছি না কী কারণে আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হলো? আমার কোনো বক্তব্যই নেয়নি তদন্ত কমিটি। দুর্নীতি তদন্তের সময়কালে তো কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে কোনো দায়িত্বেই আমি ছিলাম না।’

আপনার মতামত লিখুন :