আজও মেলেনি মুক্তিযুদ্ধে বাবর আলীর অবদানের স্বীকৃতি

তরিকুল ইসলাম, খুলনা

দীর্ঘ তিন মাস তার নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তাদের সাথে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধায় অংশগ্রহন করেন। যার ফলে সেক্টর কমান্ডার শহীদ রেজাউল ও প্রশিক্ষক এডভোকেট কেরামত আলী তাকে খোকা বলে ডাকতো। বামিয়ার শহীদ সোহরাওয়ার্দী ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন ৯ নং সেক্টরের আওতাধীন কপিলমুুনি ও খুলনা শহরে পাকবাহিনীদের বিপক্ষে মেজর এম এ জলিলে নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। খুলনার ফুলতলাস্থ মিলিশিয়া ক্যাম্পে যুদ্ধপরবর্তী ৩০৩ রাইফেল জমা দেন। তবুও দীর্ঘদিন দ্বারে দ্বারে ঘুরে স্বীকৃতির স্বাদ না নিয়ে চলে যেতে হয়েছে পরপারে। অর্থসংকটে উন্নত চিকিৎসার অভাবে কয়েকবছর প্রায় অচেতনাবস্থায় পড়ে থাকতে হয়েছে বিছানাতে। অবশেষে গেল বছরের ৯ জুন ২০১৯ মারা যান তিনি। এ প্রতিবেদকের কাছে দু:খভরাক্লান্ত হৃদয়ে এসব কথা বলেন মরহুম বাবর আলী গাজীর ছোট ছেলে মোঃ শামীম আখতার। তিনি আরও বলেন,স্বাধীনতার পরে লেখাপড়া সহ অন্যান্য কাজে এলাকার বাইরে থাকায় বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুত করা মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরে বিভিন্ন স্থানে দৌঁড়ঝাপ করেও আজো মেলেনি আমার পিতার স্বীকৃতি। মরহুম বাবর আলী গাজী খুলনার কয়রা উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের মৃত মোঃ কফিল উদ্দিন গাজীর ছেলে।

তার জাতীয় পরিচয় পত্র নং-৪৭১৫৩৭২৫৬৫৮২২ আর স্বীকৃতির জন্য আবেদনের অনলাইন সিরিয়াল নং-০০০৩৯০৮৬৮। জানা যায়, স্বাধীনতার ৫০ বছর কাটতে চললো, সমস্ত দালিলিক প্রমাণও আছে, তবুও স্বীকৃতির আশায় প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা নিহত বাবর আলী গাজীর পরিবার। তার স্ত্রীও বর্তমানে জটিল রোগে অসহায় অবস্থায় বিছানায় পড়ে রয়েছে। কান্না জড়িত কন্ঠে তার স্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, আমার স্বামী মুক্তিযোদ্ধায় অবদান রাখার পরেও স্বীকৃতি না পেয়ে চাপা বেদনায় দিনতিপাত করতো। স্বীকৃতির স্বাধ না নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাকে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও বলেন, সেতো আর শুনে যেত পারলো না, আমিও স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির খবর শুনে দুনিয়া থেকে বিদায় পারবো কিনা জানিনা। বেঁচে থাকতে স্বামীর স্বীকৃতির খবর শুনতে পারলে মনে তৃপ্তি পেতাম। সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কাছে তার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া উনি (স্বামী) জীবীত থাকতে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক টাকা ব্যায় হবে জেনে কোথাও চিকিৎসার জন্য যেতে চাইতো না বলেও জানান তিনি। ছেলেরা সব বিক্রি করে উন্নত চিকিৎসার চিন্তা করলেও তাকে নেয়া যেত না। তিনি জানান, সামান্য আয় দিয়ে জীবনে অনেক কষ্ট করে সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়েছি, মানুষের মত মানুষ করার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর রহমতে এখন তারা মোটামুটি স্বাবলম্বী। স্বীকৃতি পেলে এ জীবনে আর চাওয়া পাওয়া থাকতো না। তিনি ৯ নম্বর সেষ্টরে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তৎকালীন দেশরক্ষা বিভাগের স্বাধীনতা সংগ্রামের বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর অধিনায়ক মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ প্রদান করেন । বাবর আলী স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফুলতলা মিলিশিয়া ক্যাম্পে অস্ত্র (৩০৩ রাইফেল) জমা দেন।

মুক্তিযোদ্ধকালীন সময়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করার প্রত্যায়ন দেন কয়রাস্থ শহীদ নারায়ন ক্যাম্পের কমান্ডর এড. কেরামত আলী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ক্যাম্পের তৎকালীন কমান্ডার রেজাউল করিম যুদ্ধ পরবর্তী শহীদ হওয়ায় পাশ্ববর্তী নারায়ন ক্যাম্পের কমান্ডর বাবর আলীর স্বপক্ষে প্রত্যায়ন দেন। কয়রা উপজেলার সাবেক কমান্ডার জিএম মতিউর রহমানও তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি প্রত্যায়নে লিখেছেন স্বশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ক্যাম্পে সার্বক্ষণিক অবস্থান করেতেন এবং সর্বশেষ সহযোদ্ধাদের সাথে খুলনা শহরমুক্ত করার যুদ্ধে সহ বিভিন্ন স্থানে রাজাকারদের বিরুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া ক্যাম্পের অন্তর্ভুক্ত ১০ জন সহযোদ্ধারা তার স্বপক্ষে প্রত্যয়ন প্রদান করেন। লাল মুক্তি বার্তা ও গেজেটভুক্ত ওই ১০ জন মুক্তিযোদ্ধারা হলেন এস এম গোলাম রব্বানী (গেজেট নং ৭৯৬), আব্দুল খালেক গাজী (গেজেট নং -৮৫৮), সাইদুর রহমান (গেজেট নং-৯১১), আফসার আলী (গেজেট নং-৭৯৩), এমদাদুল হক (গেজেট নং-৭৯৮), আতিয়ার রহমান (গেজেট নং-৯১২), নুরুল ইসলাম (গেজেট নং-৮৮০), শওকত হোসেন গাজী, (গেজেট নং-৭৯৯), লূৎফর রহমান মোল্লা (গেজেট নং-৮৪৬), সুরাত আলী মোড়ল (গেজেট নং- ৮৪৮)। তার পরিবার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানান এবং সেই সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর সুদৃষ্টিও কামনা করেছেন।

 

আপনার মতামত লিখুন :