মো.ইউসুফ আলী-
চেনা মাস্তান, অচেনা সন্ত্রাসী কারনে অকারনে সাংবাদিকদের পেটায়, রক্তাক্ত করে, খুন করে,গুম করে। হরহামেশাই সাংবাদিকদের উপর সন্ত্রাসী, জনপ্রতিনিধি, পুলিশের হাত ওঠছে। সাংবাদিকরা খুন হচ্ছে। এভাবে চলে না। সাংবাদিক হত্যা আর কত সইবে জাতি? আর কত রক্ত ঝড়বে জাতির বিবেকের?
অপকর্মের সংবাদ প্রকাশ হলে সরকারি দল, বিরোধী দল সাংবাদিকের উপর চড়াও হয়। রাজপথে পুলিশ পেটায়। পুলিশ ও মাদক ব্যবসায়ী সাংবাদিকের পিছু নেয়। সাংবাদিকরা আহত হলে, নিহত হলে কতক সাংবাদিক ব্যানার হাতে রাস্তায় নামে।
পুলিশ প্রশাসনের লোকজন, রাজনীতিবীদ ছুটে আসেন, সান্তনা দেন এই পর্যন্তই। আশ্বাস মেলে ভুঁড়ি ভুঁড়ি। সান্তনার বাণী, আশ্বাস মিললেও বিচার মেলে না। এই বিচারহীন সাংস্কৃতিই সাংবাদিক নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সাংবাদিকদের লেখার সত্যতা যাচাই না করে এবং প্রেসকাউন্সিল এ্যাক্ট আমলে না নিয়ে যদি সরাসরি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া যায় তাহলে যখন তখন যে কেহই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দিতে দ্বিধা করবে না। সাংবাদিক পেটালে যদি কিছু না হয়, তাহলেতো রাস্তা ঘাটে সাংবাদিকরা মার খাবেই। তাই আজ সাংবাদিকতা পেশার নিরাপত্তা খুব জরুরী হয়ে পরেছে। সাংবাদিক যেহেতু রাষ্ট্রেরই একজন, কাজেই সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। এ দায়িত্ব সরকারকে যথাযথ ভাবে পালন করতেই হবে।
সাংবাদিকরা যাই লিখুক, সেটা কারো না কারো বিপক্ষে যায়, কেউ না কেউ ক্ষুব্ধ হয়। আর তাতেই সংক্ষুব্ধ পক্ষ মারমুখী হয়। সুযোগ পেলে গায়ে হাত তোলে, রক্তাক্ত করে, গুম করে, খুন করে, মিথ্যা বা সাজানো মামলা দিয়ে হয়রানি করে তাহলে সাংবাদিকরা কিভাবে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করবে এমন প্রশ্ন আজ পুরো সাংবাদিক সমাজের । সাংবাদিকদের উপর পুলিশও ক্ষ্যাপে, সন্ত্রাসী, রাজনীতিবিদ, মাদক ব্যবসায়ী সবাই চটে থাকে সব সময়। সাংবাদিকরা তো কারো সন্তুষ্টির জন্য লিখবে না। তাই সবার চক্ষুশূল হয় একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকরা স্বাধীন মত প্রকাশ করতে গিয়ে যদি একের পর এক সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটে কিংবা সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন তাহলে এর চেয়ে হতাশাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?
প্রশ্ন হলো সাংবাদিকদের উপর কেন একর পর এক হামলা-মামলা কিংবা নিপিড়নের ঘটনা ঘটছে ? কোনো সরকারের হাতে কেনই বা প্রণীত হয়নি একটি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন। তাইতো দেশে সাংবাদিক নির্যাতন দিন দিন বাড়ছেই। ঘটনা ঘটিয়ে পার পেলে যা হয় তাই হচ্ছে। দেশে সাংবাদিক হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি একটিরও। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দিনের পর দিন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে সাংবাদিকতা পেশা ক্রমাগতই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথাগত দুঃখপ্রকাশ ও হামলাকারীদের শাস্তির আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
খবর সংগ্রহকারী সাংবাদিকরা নিজেরাই আজ খবর হচ্ছেন। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি সাংবাদিদের কারা বরন করতে হয় তা নেহাতই দু:খ জনক ঘটনা। কিন্তু সারা জীবন সত্যের পেছনে ছুটে বেড়ানো এসব সাংবাদিকের যদি সাজানো কোন মামলায় কারা বরন করতে হয় কিংবা কোন সাংবাদিকের হত্যা রহস্য যদি হিমশীতল বরফের আড়ালেই থেকে যায় এরমত দু:খ জনক ঘটনা আর কি-ই বা হতে পারে। আমাদের আরো কিছু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা বিষয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। সাংবাদিক মানেই ধান্ধাবাজ, প্রতারক, বøাকমেইলার ও ভীতিকর কোনো প্রাণী, এমন ধারণাই পোষণ করে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। আসলে প্রকৃত সাংবাদিকরা এর কোনটাই নন। সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। এটা কেবল পেশা নয়, একজন সাংবাদিক এ সেবায় থেকে মানুষকে সেবা দিতে পারেন। এখনও সংবাদপত্র জনগনের কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বলেই দেশের মানুষ অনেকটা শান্তিতে আছেন।
অথচ সম্প্রতি টিআইবির প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরো উদ্বেগের। টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত এক বছরে (আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫) ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬৬ জনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসংক্রান্ত হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। কমপক্ষে ২৪ জন গণমাধ্যমকর্মীকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে, ৮টি সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং বরখাস্ত করা হয়েছে ১১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাপ্রধানকে । আমরা মনে করি, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিতকে আরও মজবুত করবে। তাছাড়া সাংবাদিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বতো রাষ্ট্রেরই । অথচ আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তো দূরে থাক, কোনো সাংবাদিক হত্যাকান্ডেরই বিচার হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে হরদম।
সর্বশেষ রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সোহাগ হত্যার মতোই এবার নৃশংস ঘটনা ঘটল গাজীপুরে। সেখানে চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশের জেরে আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮) নামের এক সাংবাদিককে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ৭ আগষ্ট বৃহস্পতি বার রাতে মহানগরীর ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তায় মসজিদ মার্কেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন ওই সাংবাদিক। সেখানে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যাকরে করে তুহিনকে।
এদিকে একই দিন গাজীপুর সদর থানার কাছে প্রকাশ্যে আনোয়ার হোসেন সৌরভ নামে এক সংবাদকর্মীকে পাথর দিয়ে পা থেঁতলে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এ সময় তাকে ব্যাপক মারধর করা হয়। সন্ত্রাসীদের কাছে বারবার আকুতি করেও তিনি রেহাই পাননি। নির্যাতনের শিকার আনোয়ার হোসেন সৌরভ দৈনিক বাংলাদেশের আলো পত্রিকার সাংবাদিক। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
জানা যায়, আনোয়ার হোসেন স¤প্রতি চাঁদাবাজি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে ক্ষুব্দ হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় শহরের সাহাপাড়া এলাকায় তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে তাকে উদ্ধার করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গাজীপুরের এ সাংবাদিক হত্যাকান্ডের ঘটনাটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর একটি নগ্ন আঘাত। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঘটনাটি একদিকে যেমন দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে, তেমনি অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে একটি বিপজ্জনক সংকেত বহন করে। এ ধরনের ঘটনা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথেই বাধা সৃষ্টি করে না, সাধারণ নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারও হরণ করে।
এসকল কারনগুলো অবলোকন করলে অকপটেই বলা যায় যে, আমাদের দেশের সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। গত দেড় দশকে একজন সাংবাদিক হত্যারও বিচার না হওয়া রাষ্ট্রের অমার্জনীয় ব্যর্থতা। তাই সাংবাদিকরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, তত্ত¡াবধায়ক কোনো সরকারই এ ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না। আমরা সাংবাদিক হত্যাকান্ড এবং নির্যাতনের সব মামলার দ্রæত নিষ্পত্তি চাই। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রæত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই এবং এর কোনো বিকল্প নেই।
শেষ কথা, গাজীপুরের এ হত্যাকান্ড যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসাবে থেকে না যায়, বরং এটি হোক সাংবাদিক হত্যার বিচারের একটি নতুন সূচনা। আমরা নিহত সাংবাদিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি এবং একইসঙ্গে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
মো.ইউসুফ আলী