ইজারা বাস টার্মিনালের, টোল আদায় মার্কেটে!

স্টাফ রিপোর্টার

রাজস্ব আদায়ে বাস টার্মিনালটি ইজারা দিয়েছিল সিটি করপোরেশন। শর্ত ছিল, বাস-মিনিবাস থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টোল এবং কুলি-মজুরি আদায় করবেন ইজারাদার। কিন্তু এ শর্ত ভেঙে টার্মিনালের আশপাশের বিভিন্ন মার্কেটে হানা দিয়েছেন ইজারাদারের লোকজন। সড়ক থেকে মার্কেটে সামান্য মালামাল ওঠা-নামাতে চাঁদা আদায় করছেন তারা। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে লাঞ্ছিত ও হামলার শিকার হচ্ছেন।

এই চিত্র রাজধানীর ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল এলাকার। টার্মিনালটির মালিক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু ইজারাদারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংস্থাটি। সম্প্রতি এর প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, ডিএসসিসির নগরভবন দেয়াল-ঘেঁষে এই টার্মিনালটির অবস্থান। অথচ চাঁদাবাজি বন্ধে তারা তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এই অনিয়মের সঙ্গে ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত।

এদিকে ফুলবাড়িয়া টার্মিনালের ইজারাদারের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করেছেন বঙ্গবাজার, এনেক্সকো টাওয়ার মার্কেট, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটসহ আশপাশের পাইকারি মার্কেটের ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, এসব মার্কেট থেকে নিজে বহন করার মতো মালামাল কিনে বের হলেও ইজারাদারের কুলি-মজুরির টাকা দিতে হয়। কেউ না দিলে মালামাল নিয়ে মার্কেটের বাইরে যেতে দেয়া হয় না। অথচ নিজে বহন করার মতো মালামালের কোনো ইজারা বা কুলি-মজুরির দরকার হয় না। এভাবে চলতে থাকলে এসব মার্কেট ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়বে।

ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১৩ অক্টোবর এক বছরের জন্য দুই কোটি ২৫ লাখ টাকায় ফুলবাড়িয়া স্টপওভার টার্মিনালটি ইজারা নেয় মিনহাজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ইজারার শর্ত ছিল, এই টার্মিনাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি বাস ও মিনিবাস থেকে দিনে ৪০ টাকা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে ১০ টাকা, টেম্পো থেকে ৩০ টাকা হারে টার্মিনাল ফি ও নির্ধারিত কুলি-মজুরি আদায় করা যাবে। তবে কোনো যাত্রী সামান্য মালামাল ওঠানো বা নামানোর জন্য কুলিদের সাহায্য না চাইলে মজুরি দাবি করা যাবে না। কুলিরা যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করলে ইজারা বাতিল হয়ে যাবে।

বঙ্গবাজার, ফুলবাড়িয়ার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের এমন নির্দেশনার পরও তার কিছুই তোয়াক্কা করছে না ইজারাদার প্রতিষ্ঠান। এখন তারা টার্মিনালের সীমানা ছেড়ে ফুলবাড়িয়া থেকে বঙ্গবাজার, আনন্দবাজার পর্যন্ত সড়কের দু’পাশের সব মার্কেটের ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে টোল আদায় করছে। গত ১২ নভেম্বর বঙ্গবাজার থেকে বহনযোগ্য মালামাল নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই ক্রেতাকে মারধর করেছেন ইজারাদারের লোকজন। প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা। সিটি করপোরেশন মার্কেট ফেডারেশনের নেতারা বিষয়টি ডিএসসিসি মেয়রকে জানিয়েছেন। তিনি তা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার প্রতিকার মিলছে না।

jagonews24

বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন, মার্কেটে কাপড় বা জুতার একটি একটা বান্ডেল নিয়ে যেতে হলে তাদের ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। বের করলেও টাকা দিতে হয়। গোডাউন থেকে আনলেও টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীদের লাঞ্ছিত করে। এছাড়া ক্রেতারা মার্কেট থেকে কোনো কিছু কিনে নিলেও তাদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। অথচ তারা ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের ইজারা নিয়েছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে বঙ্গবাজার থেকে কাপড়ের দুটি ব্যাগ (২০টি শাল ও শাড়ি) নিয়ে বের হচ্ছিলেন মানিকগঞ্জের দোকানি আনোয়ার হোসেন। তার কাছে ২০০ টাকা চাঁদা দাবি করেন কুলি লোকমান মিয়া। কারণ জানতে চাইলে কুলি লোকমান বলেন, ‘এটা কুলি- মজুরি।’ তখন আনোয়ার বলেন, ‘আমিতো কুলি ডাকিনি। ব্যাগ আমার হাতে। আমি কেন টাকা দেব।’ এ নিয়ে শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। পরে ১৫০ টাকা দিয়ে ছাড়া পান আনোয়ার।

ইজারার নামে এমন চাঁদাবাজি বা ক্রেতা-বিক্রেতাদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে মিনহাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাইফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফুলবাড়িয়া থেকে বঙ্গবাজার ও আনন্দবাজার পর্যন্ত সড়ক টার্মিনালের সীমানা। এই সড়ক ব্যবহার করলে টোল দিতে হবে।’

জানতে চাইলে ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের টোল আদায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইজারাদারের কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। গত মঙ্গলবার এসব সমস্যা সমাধান করে দিয়েছি।’

যদিও ভিন্ন কথা বলেছেন সিটি করপোরেশন মার্কেট ফেডারেশনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘টোলের নামে চাঁদাবাজি এবং ব্যবসায়ী-ক্রেতাদের হয়রানি বন্ধ হয়নি। সিটি করপোরেশন এই সমস্যার কোনো সমাধানও করেনি।’

আপনার মতামত লিখুন :