নিজস্ব প্রতিবেদক :
কতৃত্ববাদি আওয়ামী সরকারের পতনের এক বছর পরও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালি ফাজিল মাদ্রাসা। ’২৪ এর গণ-অভুথ্যান পরবর্তী সময়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি ভেঙে দেওয়া হলেও ওই মাদ্রাসায় বিগত আট বছর যাবত সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম (নিলু)। তার গ্রামের বাড়ি দাউদখালী হলেও তিনি দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বরিশালে। সেখানে আওয়ামী লীগের অন্যতম বড় সন্ত্রাসী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সহযোগী হিসেবে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নিজের অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ফ্যসিষ্ট আওয়মী সরকারের সময় বিভিন্ন প্রকার সরকারী সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছেন এবং এভাবেই চক্রান্ত করে দাউদখালী মাদ্রাসার সহ-সভাপতির চেয়ার দখল করে নেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সভাপতি সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার কারণে পিরোজপুর জেলা সদরে অবস্থান করায় প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় ভাবে দেখভাল করার দায়িত্ব সহ-সভাপতির উপর বর্তায়। কিন্তু তিনি মাসের পর মাস বরিশালে অবস্থান করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে গ্রামের বাড়িতে আসেন না এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে মোটেই খোঁজ খবর নেন না। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মোঃ আব্দুল কুদ্দুস এই সুযোগে সহ-সভাপতির সাথে যোগসাজসে উক্ত মাদ্রাসায় আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, শিক্ষকদের দিয়ে সঠিকভাবে ক্লাস না করিয়ে বদলি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানো, একাডেমিক কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা না করাসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে গেছেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে । শিক্ষক এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর ধরে মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ আয়-ব্যয়ের কোন অডিট হয় না এবং এর কোন ধরনের স্বচ্ছতা নেই। প্রিন্সিপাল দীর্ঘদিন যাবত এতিমখানায় ফ্রী খেতেন এবং ব্যক্তিগত অনুদানে ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নূরানী কিন্ডারগার্ডেনের জন্য স্থাপিত দোতলা ভবনের নিচতলা দখল করে সেখানে তার বাসস্থান করেছেন। এছাড়াও উক্ত ভবনের দোতলায় হিফজ মাদ্রাসার কার্যক্রম কিছুদিন পরিচালিত হলেও প্রিন্সিপালকে সেখান থেকে সঠিকভাবে আর্থিক ভাগ না দেওয়ার কারণে সহ-সভাপতি এবং প্রিন্সিপাল চক্রান্ত করে হিফজ মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে ব্যক্তিগত অনুদানের ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোতলা ভবনটি সম্পূর্ণরুপে প্রিন্সিপাল কুক্ষিগত করেছেন এবং এ কারণে ভবন নির্মাণকারী এবং হিফজ মাদ্রাসা ও নূরানি কিন্টারগার্টেন পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগত অনুদানের মাসিক ৪০ হাজার টাকাও দাতাগন বন্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলশ্রæতিতে এলাকার ছাত্ররা উক্ত শিক্ষার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন । এছাড়াও সহ-সভাপতি এবং প্রিন্সিপাল মিলে বিগত সাত আট বছর যাবত কোনরূপ নির্বাচন ছাড়াই গোপনে কমিটি করে এবং তাদের পছন্দের লোকদেরকে কমিটিতে বসায়। যে কারনে কমিটির অন্যান্য সদস্যগণ সহ-সভাপতি এবং প্রিন্সিপালের ভয়ে কথা বলতে পারে না।
স্থানীয়রা জানায়, সহ-সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম (নিলু) বছরের পর বছর মাদ্রাসার কোনরূপ মিটিংয়ে উপস্থিত থাকেন না, শুধুমাত্র মাহফিলের সময় সভাপতিত্ব করতে বরিশাল থেকে বছরে একবার মাদ্রাসার আসেন। প্রিন্সিপালের বাসাও বরিশালে হওয়ার কারণে প্রিন্সিপাল, সহ-সভাপতির সাথে দেখা করার নাম নিয়ে প্রায়শই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে বরিশালে অবস্থান করেন এবং মাদ্রাসার খরচের টাকায় তার বাসায় যাতায়াত করেন। এ কারণে অন্যান্য শিক্ষকরা ও ঠিকমতো ক্লাস করে না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাদ্রাসাটি ফাজিল মাদ্রাসা হওয়া সত্তে¡ও সেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে অত্র মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ জন হলেও ১৮ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং মাত্র ৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় কৃতকার্য হয় অর্থাৎ পাশের হার মাত্র ২২% যা প্রায় শতবর্ষী এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। তাছাড়া ২০২৪ সালে আলিম পরীক্ষায় মাত্র ৯ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ৪জন কৃতকার্য হয়েছে যেখানে ফাজিল পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে কোন তথ্যই পাওয়া যায় নাই। অন্যান্য বছর সমূহের আলিম ও দাখিল পরীক্ষার্থী ও পাশের সংখ্যা একই ধরনের হতাশাব্যঞ্জক। এ কারণে মাদ্রাসার কাছাকাছি অবস্থানরত অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের দূরবর্তী মাদ্রাসায় পাঠালেও এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে চান না।
স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়,মোঃ নজরুল ইসলাম (নিলু) পুনরায় সহ-সভাপতি হওয়ার জন্য প্রিন্সিপালকে সঙ্গে নিয়ে কমিটির অন্যান্য সদস্যদেরকে ভয় ভীতি দেখাচ্ছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় তদবির করছেন। মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মোঃ আব্দুল কুদ্দুস আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য আওয়ামী এ দোসর মোঃ নজরুল ইসলাম (নিলু) কে আবারও গভর্নিং বডিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে কোনরূপ নির্বাচন ছাড়াই পত্রালাপ করেছেন যা এলাকায় আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
এ নিয়ে দাউদখালী ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক ও স্থানীয় জনসাধারণ প্রসাশনের কাছে একটাই দাবী করেছেন, আওয়মী এ দোসর যাতে পুণরায় এ মাদ্রাসার গভর্নিং বডিতে না আসতে পারে। কারণ তিনি গভর্নিং বডিতে থাকলে প্রায় শতবর্ষী এই মাদ্রাসায় যতটুকু শিক্ষার পরিবেশ অবশিষ্ট আছে তাও ধ্বংস হয়ে যাবে। #
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম