এজাহারভুক্ত আসামী ও হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত হয়েও হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা রমেক হাসপাতাল কর্মচারী সমিতির নেতাদের কাছে জিম্মি রোগীসহ কর্মকর্তা কর্মচারীরা

তাজিদুল ইসলাম লাল, রংপুর

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ইউনিট শাখার কর্মচারীর সমিতিরি অবৈধ সভাপতি ও সম্পাদকের ক্ষমতার দাপটে অতিষ্ঠ রোগীর স্বজন, চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী ও খোদ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তারা এজাহারভুক্ত আসামী ও হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত হয়েও সকলকে জিম্মি করে পেশী শক্তির ক্ষমতা দেখিয়ে অবৈধ কমিটির কাছ থেকে অবৈধভাবে কমিটির অনুমোদন নিয়ে মাসোয়ারার ভিত্তিতে হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা। এর পাশপাশি ক্ষমতাশীন দলের এক নেতাকে ম্যানেজ করে এককালীন প্রায় ২ কোটি হাতিয়ে নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন তারা। এসব দেখার কিংবা বলার কেউ নেই। যদিওবা দু’একজন কর্মকর্তা কর্মচারী এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাদের উপর নেমে আসে জীবন নাশের হুমকিসহ নানান ধরনের প্রতারণা।

কমিটির দু’জন নেতার বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কার্যক্রমগুলো বাংলাদেশের বহু মাত্রিক জালিয়াতির হোতা শাহেদ করিমকেও হার মানিয়েছে।
সরেজমিন ও বিভিন্ন অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বাংলাদেশ ১৬-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতিটি দীর্ঘদিন থেকে মশিউর রহমান বকুল ও আশিকুর রহমান নয়ন নিজেদের দখলে রেখে নিজ খেয়াল খুশিমত পরিচালনা করছেন। তারা চলতি বছরের ১৪ ফেব্রæয়ারি প্রতারণামূলকভাবে একটি লোক দেখানো নির্বাচনের আয়োজন করেন। নির্বাচন পরিচালনার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ ৪র্থ শ্রেণীর ১৭-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতির রংপুর জেলা শাখার সভাপতি আবু সাঈদ খান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক মোজাহার হোসেনকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ ৪র্থ শ্রেণী ১৭-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতির রংপুর জেলা শাখার কমিটিটিও অবৈধ। তাদের কমিটির কোন অনুমোদন নেই। ২০১৫ইং সালের ৪ঠা জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা সরকারি চাকরিজীবী জাতীয় পরিষদ ননক্যাডার ১০-২০তম গ্রেড এর কেন্দ্রীয় কমিটি যুগ্ম মহাসচিব (প্রশাসন) মোঃ আক্তার হোসেন মুঠোফোনে জানান, বর্তমানে সরকারি কর্মচারী সমিতির নামে রংপুরে যেসব কমিটি কার্যক্রম চালাচ্ছে তা সবই অবৈধ। তাদের সরকারি কোন অনুমোদন নেই। ওইসব সংগঠন ভিত্তিহীন ও অনেক আগে বিলুপ্ত হয়েছে। আমরা ওই সকল ভিত্তিহীন সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রংপুরের প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। এছাড়াও রংপুর মেডিকেল কর্মচারী সমিতিতে বর্তমানে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারাতো রংপুর মেডিকেল থেকে স্থায়ী বরখাস্তকৃত ও অস্ত্র এবং হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী। তারা কোনভাবে কমিটিতে থাকতে পারেন না বা নেতৃত্ব দিতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, হত্যা মামলার আসামী কোন কমিটির সদস্যও থাকতে পারবে না। তারা কিভাবে কমিটি গঠন করেন তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। তারা বিগত দিনে আমাদের রংপুরের দুজন নেতাকে হত্যা করেছেন।

এসব বিষয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। করনা মহামারীর কারণে আমরা এসব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি নাই। বর্তমানে আমরা রংপুর বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকসহ আংশিক কমিটির ঘোষণা দিয়েছি। পরবর্তীতে পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। আমাদের গভ. রেজিষ্ট্রেশন নম্বর হলো ১২৭৮৮। লিখিত অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৬ইং সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোখলেছার হত্যাকান্ডের পর থেকে সেই মামলার এজাহারভুক্ত আসামী বকুল ও নয়ন চাঁদাবাজীসহ হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। তারা প্রতি মাসে ৫০টি ওষুধ কোম্পানীর রিপ্রিজেনটিভদের কাছে মাসে ৫ হাজার টাকা করে আদায় করেন। হাসপাতালের ল্যাট্রিন থেকে বাড়তি হয় মাসে ৩০ হাজার টাকা। ৫টি কোয়াটার থেকে ভাড়া বাবদ অবৈধ আয় করেন মাসে ২০ হাজার টাকা। এছাড়াও হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন ভ্রাম্যমান হিসেবে ৩২টি দোকান বসে। তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫শ করে টাকা নেন। এভাবেই তাদের মাসে বাড়তি আয় হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। এছাড়াও প্রমোশন বোর্ড করার নামে ২১ জনের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি হাতিয়ে নিয়েছেন। এর পাশাপাশি হাসপাতালে কিছু সংখ্যক আউট সোর্সিং এ জনবল নিয়োগের কথা বলে প্রায় ৫০ জনের কাছ থেকে (প্রতি জনের কাছ থেকে) ৫০ হাজার টাকা করে অবৈধভাবে ২কোটি ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন।

জানা গেছে, মোখলেছার হত্যার ঘটনায় কোতয়ালী থানা মামলা নং ২২, তারিখ- ৭-৯-২০১৬ইং। জিআর, ৭৫৭/১৬। মামলার ১নং আসামী মসিউর রহমান সর্দার, আশিকুর রহমান নয়ন, আলী আহম্মেদ মজুমদার, শাহিনুর ইসলামসহ অন্যান্যরা। ধারা- ১৪৩, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৫০৬, ১১৪, ৩০২। এছাড়াও নয়ন ১টি অস্ত্র মামলার প্রধান আসামী ও হাসপাতালের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্রাহাম লিংকন হত্যা মামলার আসাম। আরও জানা গেছে, এক দিনের ব্যবধানে এমএলএসএস হামিদুল ইসলামের অফিস সহায়ক পদে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে জরুরি বিভাগের এমসি শাখার ইনচার্জ করে দেন। তার কাছ থেকে ভানুরাম হয়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা করে আসলে নয়ন মশিউরের কাছে। এমএলএস আশরাফুল ইসলাম খোকনকে সর্দার পদে পদায়ন করে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে। মেডিকেল মোড়ের বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলো থেকে মোট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ১ জন করে প্রতিনিধি নিয়ে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৪ ফেব্রæয়ারি ২০২০ইং সমিতির নির্বাচনের সময় আর্থিক ও মানষিকভাবে সহযোগিতার না করার কারণে ক্লিনার নাহিদ হাসান বুলবুল ও এমএলএসএস আব্দুল মজিদকে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে কুড়িগ্রাম ও উলিপুর হাসপাতালে বদলি করিয়ে দেন।

এসব কাজে হাসপাতাল পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীরা বাধা দিলে তাদেরকে রুমের ভিতর ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে হেনস্থা করা হয়। জানা গেছে, হাসপাতালের নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে পরিচালক ডা. ফরিদুল হক চৌধুরী স্বেচ্ছায় অবসর নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।
আরও জানা গেছে, হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য আড়াল করতে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়া হয়। তারা যেন হাসপাতালের প্রকৃত ঘটনাগুলো সবসময় আড়াল করে রাখেন। বিভিন্ন ওয়ার্ডের কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা হাসপাতালে কাজ করে প্রতিদিন শান্তিমত বাড়ি ফিরোত যাওয়ার কোন নিশ্চয়তা পায় না। সবসময় ভীতিকর তাদেরকে পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয়। এসব অনিয়ম থেকে বের হয়ে আসতে তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা সরকারি চাকরিজীবী জাতীয় পরিষদ ননক্যাডার ১০-২০তম গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতির রংপুর বিভাগীয় কমিটির কয়েকজন নেতৃবৃন্দ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মশিউর ও নয়ন ত্রাশ চালাচ্ছে। তাদের বিভিন্ন অনিয়ম বন্ধে আমরা রংপুরের প্রশাসনসহ কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে অভিযোগ জানিয়েছি। আশা করি তারা দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

আর আমরা এসব কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
হত্যা মামলার আসামীরা কিভাবে কমিটিতে থাকতে পারেন সে বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফরিদুল হক চৌধুরীকে মুঠোফোনে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, মোবাইল ফোনেতো সব কথা বলা যায় না, আপনি সরাসরি আসেন কথা বলবো। অবসর গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ওটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।
বাংলাদেশ ৪র্থ শ্রেণী ১৭-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতি রংপুর ইউনিট শাখার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান নয়ন মুঠোফোনে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে উৎকোচ গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আর হত্যা মামলার আসামীরা কমিটিতে থাকতে পারবে না এ বিষয়টি আমাদের গঠনতন্ত্রে নেই। একারনে আমি নির্বাচন করেছি এবং জয়ী হয়েছি। আমি ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি দেখতেছি। অপরদিকে সভাপতি মশিউর রহমান বকুল এর মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়, এ কারণে তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন :