জাহেদ হাসান(কক্সবাজার) :
পরিবেশের ভারসাম্য ও ভূমিকম্প থেকে রক্ষার পাশাপাশি জলবায়ুপরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে পাহাড়। এ-জন্যই বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে পাহাড় কাটাতো দূর সেখানে পরিবর্তন পরিবর্ধন করাটাও দন্ডনীয় অপরাধ।সরকারি এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়িতে বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব।পরিবেশ সংগঠনগুলো পাহাড় কাটাকে বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি মনে করছেন এবং এবং এটি অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান।
সরেজমিনে দেখা যায়,দক্ষিণ বন বিভাগের পানেরছড়া রেঞ্জের চাইল্যাতলী, অন্ঞ্জাঘোনা, বলিপাড়া,শিয়াপাড়া,মগেরঘোনা,খরল্যারছরা,লম্বাঘোনা,মরিচ্যাঘোনা,হুয়ারীঘোনা,সমিতিপাড়া,নিজেরপাড়া,তুলাবাগান সহ একাধিক স্থানে চলছে পাহাড় কেটে মাটি ও বালু পাচারের প্রতিযোগিতা। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একাধিক স্থানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে বালুখেকো’রা। সংঘবদ্ধ পাহাড়খেকো সিন্ডিকেট সদস্যরা বনাঞ্চলের ভেতরে পাহাড় কেটে ডাম্পারে করে রাতদিন মাটি পাচার করছে।অন্যদিকে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করে পাচার অব্যাহত রেখেছে। পাহাড় খেকো ও বালুখেকো সিন্ডিকেট বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বন কর্মীদের সাথে আঁতাত করে এসব কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। এতে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়,চাইল্যাতলী এলাকার ৩টি বিশাল উঁচু পাহাড় সাবাড় করছে তিন পাহাড়খেকো।এই তিন পাহাড় খেকো মিলে রাতদিন পাহাড় কেটে ডাম্পার গাড়িতে করে মাটি পাচার করলেও রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা নিরবতা পালন করছে!তিনটি পাহাড়ের মধ্যে একটি সাবাড় করছে স্হানীয় ডাম্পার মালিক বন মামলার আসামি সিহাব উদ্দিন,২য়টি সাবাড় করছে স্থানীয় বিএনপি নেতা মোক্তার আহমদ প্রকাশ মোক্তার মেম্বার।পাহাড়টি তার বাড়ি সংলগ্ন হওয়াতে ঘরে বসে দিনরাত পাহাড় কেটে মাটি পাচার অব্যাহত রেখেছে। ৩য় পাহাড়টি সাবাড় করছে স্থনীয় ডাম্পার মালিক আওয়ামী দোসর শফিউর রহমান। তার বিরুদ্ধে একাধিক বন মামলা থাকলেও এসব উপেক্ষা করে রাতদিন পাহাড় কেটে মাটি পাচার অব্যাহত রেখেছে!
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,চাইল্যাতলীর এই তিন পাহাড় কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন চাইল্যাতলীর বিএনপি নেতা মোক্তার আহমদ প্রকাশ মোক্তার মেম্বার।তার সিন্ডিকেটে রয়েছে একাধিক ডাম্পার মালিক,তারা হলেন,শফিউর রহমান,সিহাব উদ্দিন,জসিম প্রকাশ সোনা মিয়া,বদি আলম,মাহমুদুল হক।এদের দিয়ে দিনরাত পাহাড় কেটে মাটি পাচার করে পরিবেশ’কে হুমকির মুখে ফেলছে! এই রেঞ্জের আওতাধীন অন্ঞ্জাঘোনা,বলিপাড়া,খরলিয়ারছড়া, লম্বাঘোনা, মরিচ্যাঘোনা, শিয়াপাড়া ও মগেরঘোনা সহ একাধিক স্থান থেকে মাটি ও বালু পাচার করছে হেডম্যান ছৈয়দ নুরের ছেলে নজরুল ইসলাম,আব্দুর রহিম, সরওয়ার,নুরুল ইসলাম,নুরুল হক ও আবুল বশর।তারা বন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ডাম্পার গাড়িতে করে মাটি ও বালু পাচার করছে। এদিকে একটি বনের গাছ পাচার সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এই রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন স্থান থেকে বনের গাছ কেটে পাচার করে বনায়ন বিরান ভূমিতে পরিনত করছে!কিছুদিন আগেও এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা হুওয়ারীঘোনার চিকনছড়ি ও সমিতিপাড়া থেকে বনের গাছ কেটে রাতদিন ডাম্পার গাড়িতে করে পাচার করলেও বন বিভাগ নিরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। গোপন সূত্রে পাওয়া,পানেরছড়া রেঞ্জের বন অপরাধীদের সাথে রেঞ্জ কর্মকর্তা শরীফুল আলম,বিট কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বিদ্যুৎ ও বিটের স্টাফ শাহেদুল ইসলাম ও মোক্তার সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।বন অপরাধী’রা এদের মাধ্যমে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা’কে ম্যানেজ করে নির্বিচারে পাহাড় ও বন নিধন করছে।পাহাড়খেকো,বালুখেকো,বনের গাছ পাচারকারী, বনভূমি দখলকারী ও বনভূমিতে অবৈধ স্হাপনা নির্মাণকারীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে বন অপরাধ করার সুযোগ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।এসব বন অপরাধের পিছনে রেঞ্জ কর্মকর্তা, বিট কর্মকর্তা ও ফরেস্ট গার্ড’রা পরোক্ষভাবে জড়িত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন,অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ফলে ভয়াবহ ভূমিধস, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, বনাঞ্চল নিধন ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।পাহাড় কাটার ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে শত শত মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। পাহাড় কাটা দন্ডনীয় অপরাধ হলেও এর সঠিক প্রয়োগের অভাবে এটি বন্ধ হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এইচ এম এরশাদ বলেন, পাহাড় হলো প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা, গাছ কাটা এবং বন্যপ্রাণী নিধন পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।প্রভাবশালী ও অসাধু চক্র অবৈধভাবে পাহাড় কাটছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা বা অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসে।পাহাড় কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি দোষীদের বিরুযদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও)আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন,পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর,ইতোমধ্যে জড়িত ৪ জনের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দেয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলে খুব শীগ্রই যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ