কক্সবাজারে বনভূমিতে দালাল ফিরোজের বিশাল অট্টালিকা

জাহিদ হাসান, কক্সবাজার

কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের বিভিন্ন বনবিট এলাকায় থেমে থেমে চলছে বনভূমি দখল উচ্ছেদ। এসব অভিযানে প্রকৃতি প্রেমীদের মাঝে খুশি বিরাজ করলেও ক্ষোভে ফুঁসছে ভাঙ্গনের কবলে পড়া দখলকাররা। কারো ঝুপড়ি, কারো কাঁচা বাড়ি বা কারো বনের সমতল এলাকার ঘর ভাঙ্গলেও ফুলছড়ি রেঞ্জের নাপিতখালী বিটের সড়কের পাশে বনায়ন ও পাহাড় কেটে উঠতে থাকা সুরম্য দালানটি তাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। এটিতে বনবিভাগের হাত না পড়ার ‘রহস্য’ কি তা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। বনসহ সব বিভাগ ম্যানেজ করেই বনায়ন কেটে দখল ও ভবন তৈরীর অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঈদগাঁও থানা ভবন ও ফকিরাবাজারের পাশে লাগোয়া সামাজিক বনায়নের গাছ ও পাহাড় কেটে প্রায় দু’একর জমি কাটাতারের ঘেরা দিয়ে বিশালাকার দৃষ্টিনন্দন ভবন তুলছেন ফিরোজ আহমদ নামে (স্থানীয় ভাবে থানার দালাল হিসেবে পরিচিত) একব্যক্তি। ভবনের পাশে তৈরী হয়েছে টিনের ছাউনি দেয়া ভাড়া বাসাও।

ফকিরাবাজারে ‘সোনালী এন্টারপ্রাইজ’ নামে আলিশান অফিসেই পুলিশ ও বৃহত্তর ঈদগাঁওর অপরাধ নিয়ন্ত্রকদের নিয়ে ফিরোজের সিন্ডিকেট ব্যবসা। ফিরোজের লোকজন প্রচার করছেন, ২৫ লাখ টাকায় বনবিভাগসহ সকল সেক্টর ম্যানেজ করেই ফিরোজ অত্যাধুনিক বাড়িটি করছেন। এখানে সদ্য ঘোষিত ঈদগাঁও থানার অফিসার কিংবা আগ্রহী পুলিশ সদস্যদের ‘ফ্রি’তে রাখা হবে। ২০২০ সালের করোনাকাল হতে ভবন নির্মাণ কাজ এক বছর ধরে চললেও একটি বারের জন্যও বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা অন্যকোন সংস্থা সড়ক থেকে দৃশ্যমান এ নির্মাণ কাজে বাধা দিতে যায়নি। ফলে, ফিরোজের সিন্ডিকেটের প্রচার করা তথ্যই সঠিক ভেবে স্থানীয় বনপ্রেমী জনতা কিংবা পরিবেশবাদী সংগঠনও এর প্রতিবাদ করছে না। বনবিভাগের জমিতে ভবন তোলার কথা স্বীকার করে ফিরোজ আহমদ বলেন, এটি স্থানীয় মমতাজুল উলুম মাদ্রাসার নামে দখল ছিল। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকায় দখল কিনেছি। পুরো বৃহত্তর ঈদগাঁও এলাকায় বনভূমি দখল করে অগণিত ঘর উঠেছে। আমি করলে দোষ কোথায়? এভাবে সামাজিক বনায়ন ও পাহাড় কেটে বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা অন্যকোন সংস্থার বাধাহীন কিভাবে বাড়ি করছেন? লোকজন প্রচার করছে ২৫ লাখ টাকায় সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ম্যানেজ করে নির্বিঘেœ কাজ সারছেন-এটা কি সঠিক, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বনের জমিতে অন্যরা যে পদ্ধতিতে বাড়ি করেছে আমিও সেই পথে হেটেছি।

কে কি বলছে, তা বিবেচ্য নয়। সোনালী এন্টারপ্রাইজের নামে আমরা এখানে অফিস করে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও স্থানীয় সরকারদলীয় রাজনীতিক এবং জেলা নেতাদের স্বজনদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসা করছি। পুলিশের সাথেও দীর্ঘদিন কাজ করে আসছি, এজন্য হয়তো ‘সম্মান’ জানিয়ে কেউ কিছু বলেনি। বনভুমি দখল ও বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য নিতে মমতাজুল উলুম মাদ্রাসার পরিচালককে ফোন করা হলেও রিসিভ না হওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের শুরুতে এখানে দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিযানে উচ্ছেদে গেলে অনেকে ফিরোজের বিষয়টি সামনে আনেন। খোঁজ নিয়ে দেখেছি যেখানে সুরম্য বাড়িটি করা হচ্ছে তা ২০০৭-২০০৮ সনের সামাজিক বনায়ন। ঘর করতে গিয়ে গাছ ও পাহাড় কেটেছেন নির্বিচারে। এটি বনের অনেক মূল্যবান জায়গা। ফিরোজের পক্ষ হয়ে দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা নামধারি ব্যক্তি, একাধিক চেয়ারম্যান নানা ভাবে ফোন করছে। আগে কি হয়েছে জানিনা, আমি বনবিক্রির মতো অপকর্ম করিনি।

শৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতা পেলে আইনী প্রক্রিয়ায় এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দু’মিনিটও চিন্তা করবো না। ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হালিম বলেন, জেনেছি থানার প্রবেশ পথে সোনালী এন্টারপ্রাইজ নামে আলিশান অফিসে বসা ফিরোজ পুলিশের দালালি করে নানা অপকর্ম করেছে। আমি আসার পর হতে তার থানায় ঢুকাও নিষেধ। সরকার আমাদের ঘরভাড়া দেয়। সরকারি জমি দখলে করা বাড়িতে ‘ফ্রি’তে অফিসার নয়, আমার থানার কোন পুলিশও থাকবে না। বনবিভাগ চাইলে উচ্ছেদে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা দেবো। কক্সবাজার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (উত্তর) মো. তহিদুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের বন দেশ এবং স্থানীয়দের সম্পদ। এটি রক্ষায় বনবিভাগেকে সহযোগিতা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। এ দালানটির বিষয়ে জেনেছি। আইনী পথে বনভূমিটি জবরদখল মুক্তকরে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার পরই লেনদেনের বিষয়টি পরিস্কার হবে।

আপনার মতামত লিখুন :