কাজী নজরুলের কাব্য ও গানে ‘মৃত্যু ভাবনা’

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

ড. হাফিজ রহমান

বাংলা সাহিত্যের আকাশে যুগ যুগ ধরে উজ্জ্বল আলোর মতো দীপ্তিমান, অমর কবি কাজী নজরুল ইসলামের আজ মৃত্যু দিবস। আমাদের দোয়া, আল্লাহ উনাকে ভালো রাখুন। ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে পরিচিত হলেও তার কাব্য ও গানের ভেতরে শুধু বিদ্রোহ নয়, ছিল গভীর আধ্যাত্মিকতা, প্রেম, মানবতাবোধ ও মৃত্যুচিন্তা। মৃত্যুকে তিনি কখনও ভয়ঙ্কর অন্ধকার হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন তা জীবনের পরিপূর্ণতা, মুক্তি ও স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের দ্বাররূপে। তার কবিতা ও গানগুলোতে মৃত্যুর ভাবনা এসেছে নানা আঙ্গিকে। কখনও ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, কখনও ব্যক্তিগত বেদনা ও বিষণ্নতার ছায়ায়। আবার কখনও বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক হিসেবে। সাধারণ দ্রোহাত্মক কবিতা ও গানে মৃত্যুকে তিনি ভয় না পেলেও, মৃত্যুকে জয় করার কথা বললেও, ধর্মীয় দিক দিয়ে যখন তিনি চিন্তা করেছেন এবং নাশিদ লিখেছেন, তখন পরকালীন বিচারকে তিনি চরম ভয়ের ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। যে কারণে পরকালে আল্লাহর আদালতে তার বিচার হোক, সেটা তিনি চাননি। বরং আল্লাহর কাছে তিনি দোয়া করেছেন ‘রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করো না বিচার।’

 

ইসলামী সংস্কৃতি, সুফিবাদ, ভক্তি-আন্দোলনের প্রভাব এবং ব্যক্তিগত ধর্মীয় চেতনা তার কাব্যে আধ্যাত্মিক রূপকে বহুমাত্রিক করেছে। তিনি যেমন প্রেম ও মানবতার কবি, তেমনি ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতেরও এক অনুসন্ধানী সাধক।

 

মৃত্যু ভাবনার আধ্যাত্মিক রূপঃ

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে গভীর ধর্মীয় চেতনা ছিল। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে মৃত্যু হলো: দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের অবসান এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা। নজরুলের হামদ, নাত, গজল ও ইসলামী সংগীতে মৃত্যুচিন্তা বারবার প্রতিফলিত হয়েছে পরকালীন মুক্তির অপার অভিপ্রায়ে।

তার দৃষ্টিতে মৃত্যু ভয়ের কিছু নয়, বরং মহান স্রষ্টার কাছে প্রত্যাবর্তন। তিনি মনে করতেন, মৃত্যু মানে মানুষের অহংকার ভেঙে দেওয়া, মানুষকে তার আসল পরিচয়ে ফিরিয়ে নেওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি মৃত্যুকে আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক করেছে। তার অনেক ইসলামী গানে (মহররম ভিত্তিক গান) শহীদদের রক্ত ও মৃত্যুকে তিনি ঈমান ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ প্রকাশ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। একইসঙ্গে নজরুল কাব্যে সুফিবাদের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সুফি দর্শনে প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার সঙ্গে মিলনই চূড়ান্ত লক্ষ্য। তার গজলসমূহে পার্থিব প্রেম বস্তুত আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তিনি ‘লাইলী-মজনু প্রেম’ কিংবা ‘ইউসুফ-জুলেখার কাহিনি’ ব্যবহার করেছেন স্রষ্টা ভক্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে।

নজরুলের কাব্যে আধ্যাত্মিকতার একটি দার্শনিক মাত্রাও আছে। তিনি মনে করতেন, জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আত্মা চিরন্তন। মৃত্যু হলো, সেই আত্মার মুক্তি ও স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের শাশ্বত পথ। তার ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে তিনি মৃত্যুকে জীবনের অবধারিত আধ্যাত্মিক পরিণতি হিসেবে দেখেছেন। এমনকি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেও আল্লাহর মহিমা, সৃষ্টি-সংহার ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতি বিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে আধ্যাত্মিক রূপ বহুমাত্রিক। ইসলামী ভাবধারা, সুফি মরমীবাদ, ভক্তি-বাদের ভক্তিসুর এবং দার্শনিক জীবনদৃষ্টি সবিশেষ উল্লেখ্য। তার কাছে আধ্যাত্মিকতা মানে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত মুক্তি, প্রেম ও স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের সাধনা। ফলে নজরুলের আধ্যাত্মিক কাব্যধারা শুধু মুসলিম সমাজকেই নয়, বরং সমগ্র মানবজাতিকে এক মহৎ ঐক্যের দিশা দেখিয়েছে।

 

দার্শনিক ব্যাখ্যা

নজরুলের কাছে মৃত্যু ছিল জীবনের পরিপূর্ণতা। তার কবিতা ও গানে জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও মৃত্যু অনিবার্য সত্য। তবে এই মৃত্যু মানুষকে অমরত্ব দেয়- সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে, আত্মত্যাগ ও প্রেম-আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমেই।

 

কিছু গান, দৃষ্টিভঙ্গি ও মৃত্যু

কাজী নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যু ভাবনা’ ভয়ের নয়, বরং আশা, মুক্তি ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তিনি মৃত্যুকে কখনও দেখেছেন আধ্যাত্মিক মিলনের দ্বার, কখনও সংগ্রামী জীবনের মহিমা, আবার কখনও ব্যক্তিগত শোক ও বেদনার প্রতীক রূপে। তার কাব্য ও গানে মৃত্যু ভাবনা আমাদের শেখায়, মৃত্যু হলো: জীবনের অবধারিত সমাপ্তি। কিন্তু আদর্শ, প্রেম ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানুষ মৃত্যুর পরও অমরত্ব লাভ করে।

‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি/করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঝের ঝরা ফুলগুলি।’

 

এই যে প্রকৃতির সঙ্গে গানের পাখির তিরোধানের সম্পর্ক সৃষ্টি, এখানে নতুন এক সম্পর্কের চমৎকার সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।  যখন কেউ মৃত্যুবরণ করে, তখন তার চারপাশের সবকিছু শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আত্মীয়-পরিজন,  বন্ধু-বান্ধব, গাছপালা, তরুলতা সবকিছু শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ে।

অপরদিকে ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনুঁ গো আঁখি খোলো।/প্রিয়তম! এতদিনে বিরহের নিশি বুঝি ভোর হলো/ মজনুঁ! তোমার কাঁদন শুনিয়া মরু-নদী পর্বতে/ বন্দিনী আজ ভেঙেছে পিঞ্জর বাহির হয়েছে পথে।’

প্রিয়তমের মৃত্যুতে আবেগঘন বেদনার মর্মমূলে গভীরতম ভাবনার এই যে প্রকাশ, তা নিঃসন্দেহে মানুষকে সরল সঠিক পথে ফেরাবার নতুন পথের অভিনব রূপ। নজরুল তার বহু কবিতা-গানে মৃত্যুকে বারবার বহুরূপে, নানারূপে গভীর থেকে গভীরতমভাবে প্রকাশ করেছেন।

ভালোবাসা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং অমরত্ব নিয়ে নজরুলের আরও একটি অসাধারণ গানের স্থায়ী এমন- ‘আমায় নহে গো- ভালোবাসো, শুধু ভালোবাসো মোর গান।/ বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হ’লে অবসান।’

মানুষ যখন জীবিত থাকে, কর্মক্ষম থাকে, উদ্যমী থাকে, ততদিন থাকে মানুষের মূল্যায়ন, সম্মান-মর্যাদা। মানুষ যখন আয়-রোজগার করে, সংসার, পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, ততদিন পর্যন্ত মানুষের গুরুত্ব থাকে। কিন্তু দিনে দিনে যখন কর্মক্ষমতা লোপ পায়, বার্ধক্য নেমে আসে, আয়-রোজগার থাকে না, তখন মানুষ পরিবার-পরিজন সমাজে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সম্মানও হারিয়ে ফেলে। যেমন- গান অবসান হলে বনের পাখিকে কেউ চিনে রাখে না, অথবা ঢোল-তবলা, হারমোনিয়াম এগুলোর খোঁজ কেউ রাখে না, তেমনি মানবজীবনও এমনই কঠোর কঠিন নিয়মের ছকে বাঁধা। চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয়ে যায়। বেঁচে থাকলে বন্ধু-স্বজন, প্রিয়জনের অভাব নাই। মৃত্যুর পরে দোয়া করার মানুষ‌ও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই মৃত্যুর পরও মানুষ চায় অমরত্ব। মানুষের মনের মাঝে বেঁচে থাকতে চায়। মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই কবির এই গানটি।

প্রিয়জনকে কেউ বিদায় দিতে চায় না। ক্ষণিকের জন্য চোখের আড়াল হোক, তা চায় না। গভীর প্রেমে আবদ্ধ মানুষ‌ও কখনও বিদায় নিতে চায় না। তারপরও যখন সময় শেষ হয়ে যায়, দুয়ারে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, তখন মৃত্যুর গাড়িতে যাত্রী হতেই হয়। এই গানটির বহু রকম অর্থ থাকলেও ভাবনার একটি শাখা এমনও। সেই ভাবনা নিয়েই কবি লিখেছেন, ‘আমার যাবার সময় হলো, দাও বিদায়।/ মোছ আঁখি, দুয়ার খোলো, দাও বিদায়।’

নজরুলের আত্মবিশ্বাস বলত, মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে থাকবেন। তার যে সৃষ্টিকর্ম, তা নিয়ে গবেষণা হবে। মানুষের মনের মন্দিরে তিনি চির জাগরুক হয়ে থাকবেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র পৃথিবী তাকে নিয়ে গবেষণা করবে। তার গানের কারণে তাকে ভুলতে পারবে না। এমন একটি শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস তিনি প্রকাশ করে গেছেন। নিজের মনের আকুতি তাই তিনি প্রকাশ করেছেন গানের মাধ্যমে, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব/তবু আমারে দেব না ভুলিতে।’

নজরুলের মৃত্যুচিন্তার পেছনে তার ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাও গভীরভাবে জড়িত। ছোটবেলায় বাবাকে হারানো,  মায়ের দ্বিতীয় বিবাহ, সন্তানদের অকালমৃত্যু, বন্ধুবান্ধব, প্রিয়-স্বজনদের মৃত্যু, আজন্ম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন, বহুরকম প্রতারণার শিকারসহ আশা ভঙ্গের হতাশা, দুঃখ-কষ্ট তার কাব্যে মৃত্যুচিন্তাকে আরও মর্মস্পর্শী করেছে। নজরুল প্রিয় সন্তান বুলবুলকে হারিয়ে লিখেছিলেন গভীর শোকগাথা, যেখানে মৃত্যুকে তিনি কঠিনতম বিদায় হিসেবে প্রকাশ করেছেন। এইসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে মৃত্যুর বিষয়টি এক ধরনের মুক্তি হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছিল। তার পরবর্তী কাব্যে বিষণ্নতা ও শোকের ছায়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নজরুলের অনেক কবিতা ও গানে মৃত্যুকে বিষণ্নতার ছায়ায় দেখা যায়। মৃত্যুর ভয়াবহতা নয়, বরং তার অবধারিত সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া তার শোকগীতি ও স্মৃতিগানগুলোতেও মৃত্যু এসেছে মানুষের জীবনের নশ্বরতার চিহ্ন হিসেবে। যেমন মহররমের গানে তিনি ইমাম হোসেন ও কারবালার শহীদদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেই শোকের মধ্যেই রয়েছে আত্মত্যাগ ও অমরত্বের গৌরব।

নজরুল ছিলেন গানের কবি। তার প্রায় চার হাজার গান আজও বাংলার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। এসব গানে মৃত্যুর প্রতিফলনও নানাভাবে এসেছে। ইসলামী গানে মৃত্যু আখিরাতের দ্বার, মৃত্যুর পরের জবাবদিহি ও মুক্তির শিক্ষা হিসেবে প্রকাশিত। অপরদিকে, প্রেমের গানে মৃত্যু মানে চিরবিদায়, প্রিয়জন হারানোর ব্যথা। দেশাত্মবোধক গানে মৃত্যু মানে শহীদি জীবন, মাতৃভূমির জন্য আত্মত্যাগ, যা মৃত্যুর পরও অমরত্ব এনে দেয়। ফলে তার গানে মৃত্যুর ধারণা কখনও ভীতিকর নয়; বরং তা এক উচ্চতর মহিমার প্রতীক।

এভাবে মৃত্যু তার কাছে এক চূড়ান্ত মুক্তি, যেখানে মানুষ নিজের অহংকার ও দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে স্রষ্টার সঙ্গে মিলিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য ও গানে মৃত্যু ভাবনা বহুমাত্রিক। তিনি কখনও মৃত্যুকে দেখেছেন আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে, কখনও বিদ্রোহের চ্যালেঞ্জ হিসেবে, আবার কখনও ব্যক্তিগত বেদনার পরিণতি হিসেবে। তার সাহিত্যজীবন আমাদের শেখায়- মৃত্যু ভয়ের নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক সমাপ্তি, মৃত্যু মানুষের আদর্শ ও সৃজনকে অমর করে তোলে। মৃত্যুর মত সত্যকে মেনে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে মানবতার মুক্তি। ফলে, নজরুলের কাব্য ও গানে মৃত্যু ভাবনা শুধু শোকের নয়, বরং এক চিরন্তন জীবনের, সংগ্রামের এবং মুক্তির দার্শনিক অভিব্যক্তি।

 

লেখক: নজরুল গবেষক

 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ

বিজ্ঞাপন