কুষ্টিয়া ডিসি অফিসে কর্মচারী নিয়োগে কোটি টাকার বাণিজ্য

খায়রুল আলম রফিক

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক নিয়োগে শিক্ষা সনদ জালিয়াতি, ৩০ বছরের বেশি বয়সের প্রার্থীদের নিয়োগসহ পদ ছাড়াই চর্তুথ শ্রেণির ২১ কর্মীকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের বিরুদ্ধে। প্রথমে মধ্য বয়সীদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও তদন্ত না করেই নিজ বাসার বাবুর্চির বোনসহ ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের চুড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট অফিসের রাজস্ব শাখায় ১৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ নিয়ে হৈচৈ শুরু হলে জেলা প্রশাসক অফিসের চর্তুথ শ্রেণির ২১ কর্মীকে পদায়ন ছাড়াই পদোন্নতি দেওয়া হয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এই পদোন্নতিপত্রে স্বাক্ষর করা হয়। অভিযোগকারীরা বলছেন, ১৬ জন নতুন কর্মী নিয়োগ এবং ২১ কর্মীর পদোন্নতি দিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য করা হয়েছে। ২১ কর্মীর পদোন্নতিতে যেসব পদ শূন্য হয়েছে নিয়োগবঞ্চিতদের সেখানে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন ডিসি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য গোপন করে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন দাখিল করে টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছেন। মৌখিক পরীক্ষা শেষে গত ২০ আগস্ট মধ্যরাতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ১৬ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়।

এর আগে গত বছর ১৬ সেপ্টেম্বর একজন নৈশ প্রহরীসহ ১৫ অফিস সহায়ক পদে দরখাস্ত আহ্বান করলে দুই হাজার ৬০০ প্রার্থী আবেদন করেন। নিয়োগে অনিয়ম হওয়ায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৫-২০ বছর ধরে কমর্রত ওমেদারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে জেলা প্রশাসক তাঁদের ডেকে কিছুদিনের মধ্যে বঞ্চিতদেরও নিয়োগ দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। চাকরি প্রত্যাশীরা অভিযোগ করেছেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় জেলা প্রশাসকের বাসায় কর্মচারীদের আত্মীয়-স্বজন এবং যাঁরা তাঁর ব্যক্তিগত কাজ করতেন তাঁরাই নিয়োগ পেয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলা প্রশাসকের বাসার বাবুর্চি বিল্লাল হোসেনের বোন কুমারখালীর সাওতা গ্রামের সাবিনা ইয়াসমিন। চাপড়া ইউনিয়নের ভোটার তালিকায় তাঁর ভোটার নম্বর ৫০০৮৮৮৫৯৩৯১৬, জন্ম তারিখ ১০ জুন ১৯৮১। ভোটার তালিকা অনুযায়ী সাবিনার বয়স ৩৯ বছর। সাবিনা স্থানীয় লাহিনীপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৫ সালে অস্টম শ্রেণি পাস করেন বলে শিক্ষা সনদ দাখিল করলেও ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কলিম উদ্দিন জানান, এই সনদ তাঁর স্কুলের নয়। এ রকম সনদ বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।

নিয়োগ আবেদনের শর্তাবলির মধ্যে আবেদনকারীর বয়স ১০-১০-২০১৯-এ ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং ১১ নম্বরে মৌখিক পরীক্ষার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে আনতে বলা হলেও এর কোনোটাই মানা হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে আরেকজন ওমেদার শরিফুল ইসলাম। ঘুষ লেনদেনের কারণে ২০১৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন তাঁকে জেলা প্রশাসন থেকে বের করে দেন। বর্তমান জেলা প্রশাসক কুষ্টিয়ায় যোগদানের কিছুদিন পর শরিফুলকে আবার ওমেদার হিসেবে বহাল করে গড়াই নদের জিলাপিতলা বালিরঘাট থেকে তাঁর নামে দৈনিক টাকা আদায়কারী হিসেবে নিযুক্ত করেন। লাহিনী গ্রামের মাহাতাব শেখের ছেলে শরিফুল কুষ্টিয়া পৌর এলাকার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ৫০০৭৭৯২৩৪৩৮৩ ভোটার। তাঁর জন্ম তারিখ ২৬ নভেম্বর ১৯৮৬। ভোটার তালিকা অনুযায়ী শরিফুলের বয়স ৩৪ বছর। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে মিলন হোসেন ও নাসরিন আক্তার জেলা প্রশাসকের বাসার আরেক কর্মচারী কামরুল ইসলামের আপন ভাই ও চাচাতো বোন। নাসরিন পাবনার সুজানগর পৌরসভার বাসিন্দা হলেও নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে তাঁকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত আনিসুর রহমানও বালিরঘাট থেকে জেলা প্রশাসকের নামে টাকা আদায়কারী হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে নিয়োগপ্রাপ্তরা একজোট হয়ে এনআইডি সংশোধনের জন্য জেলা নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী কার্ড তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বাসার কাজের ছেলে হেলালও অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে গত ২৪ আগস্ট একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে ওই দিনই ডিসি তড়িঘড়ি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে প্রত্যেকের নামে সার্ভিস বুক চালু করেন। তবে সংশ্রিষ্ট কর্মকর্তারা এখনো তাতে স্বাক্ষর করেননি। পরে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার আনোয়ার হোসেন হাওলাদার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনকে খুলনায় ডেকে নিয়োগে অনিয়মের কারণে তাঁকে তিরস্কার করেন। অভিযোগকারীরা বলছেন, এই নিয়োগে জেলা প্রশাসক কোঠাধারীদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ, অন্যদের কাছ থেকে ১৫ লাখ করে টাকা নিয়েছেন। এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই কার্যালয়ের সাধারণ শাখায় ১৬ অফিস সহায়ক নিয়োগেও জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির অনেক তথ্য-প্রমাণ কাছে সংরক্ষিত আছে। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, নিয়োগে অনিয়মের মধ্যেই জেলা প্রশাসক অফিসের চতুর্থ শ্রেণির ২১ কর্মীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে । ফলে আগের পদেই তাঁরা রয়েছেন। এই ২১ কর্মীর মধ্যে ৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীকে প্রসেস সার্ভার পদে, তিনজন নিরাপত্তা প্রহরীকে ফটোকপি অপারেটর পদে, তিনজন নিরাপত্তা প্রহরীকে দপ্তরি পদে, তিনজন পরিচ্ছনতাকর্মীকে প্রসেস সার্ভার পদে, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দপ্তরি পদে, একজন ফরাস-কর্মীকে প্রসেস সার্ভার পদে এবং একজন অফিস সহায়ককে প্রসেস সার্ভার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, ‘যা কিছু করা হয়েছে, সবই নিয়মের মধ্যে করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।

 

আপনার মতামত লিখুন :