নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন একই ধরনের ছবি ব্যবহারের ফলে মানুষ এসব সতর্কবাণীর প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সতর্কবাণীর ছবি নিয়মিত পরিবর্তন এবং আরও শক্তিশালী ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাজধানীর বনানীতে একটি হোটেলে “তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রভাব ও বিকল্প ছবির প্রয়োজনীয়তা” শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি)।
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৯ শতাংশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রভাবে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেছেন এবং প্রায় ২৭ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব সতর্কবাণী তাদের ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করেছে। তবে ৪৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, সিগারেট বা বিড়ির খুচরা শলাকা কেনার কারণে তারা এসব সতর্কবার্তা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করার সুযোগ পান না।
গবেষণাটি অক্টোবর ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ সময়কালে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ জন ধূমপায়ী ও অধূমপায়ীর ওপর জরিপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি পাঁচজন বিশেষজ্ঞের কী-ইনফরমেন্ট সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় ৫১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র সতর্কবাণী লক্ষ্য করেছেন। তবে ৫৪ শতাংশের মতে, দীর্ঘদিন একই ছবি ব্যবহারের কারণে এসব সতর্কবাণী আর তেমন প্রভাব ফেলছে না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার একটি কার্যকর পদ্ধতি। এটি শুধু ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করে না, নতুনদের ধূমপান শুরু করতেও নিরুৎসাহিত করে। তবে সতর্কবাণীর কার্যকারিতা ধরে রাখতে নিয়মিতভাবে ছবির সেট পরিবর্তন এবং আরও শক্তিশালী ছবি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ শাগুফতা সুলতানা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন একই ছবি ব্যবহারের ফলে মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। তাই তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরতে আরও বাস্তবধর্মী নতুন সতর্কচিত্র সংযোজন করা প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান।
বক্তারা জানান, বিশ্বের অনেক দেশ নিয়মিতভাবে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে থাকা সচিত্র সতর্কবাণীর ছবি পরিবর্তন করছে। ফিলিপাইন ২০১৬ সালের পর থেকে ছয়বার, দক্ষিণ কোরিয়া পাঁচবার, মিয়ানমার তিনবার, কলম্বিয়া ২০১০ সালের পর থেকে ১৬ বার এবং ভারত ২০০৯ সালের পর থেকে আটবার ছবির সেট পরিবর্তন করেছে। অথচ বাংলাদেশে ২০১৬ সালে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী চালুর পর গত ১০ বছরে একবারও ছবি পরিবর্তন করা হয়নি।
আলোচকরা বলেন, দেশে সিগারেট ও বিড়ির খুচরা শলাকা বিক্রির কারণে অনেক ধূমপায়ী মোড়কের সতর্কবাণী দেখার সুযোগ পান না। তাই খুচরা শলাকা বিক্রি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সতর্কচিত্র আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকরা অংশ নেন। তারা তামাক নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি প্রণীত অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করা, ৭৫ শতাংশ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন এবং আইন লঙ্ঘনকারী তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।