নিহত ২৬- গুরুতর ৫ শোকে ভারি শিবচরের পদ্মারপাড় পদ্মায় স্পিডবোটে যাত্রী বহনে বৈধতা নেই, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ উদাসীন। স্পিডবোর্ড চালকের খামখেয়ালিপনা

শেখ কালিমউল্যাহ নয়ন/ মো.বশির আহমেদ

প্রশাসনের উদাসীনতা আর স্পিডবোট চালকের খামখেয়ালিপনায় সূর্য্য না উঠতেই ২৬ জনের সলিল সমাধি হয়েছে। ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন ৫ জন। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। গতকাল সোমবার সকালে মাদারিপুর জেলার শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ঘাটের কাছে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় এর আগে মাওয়া ঘাট থেকে কাঁঠালবাড়িগামী লঞ্চ ডুবিতে অর্ধশত ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। গতকালের ঘটনায় ওই নদীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৬ সদ্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় মিলেছে।
গতকাল ভোরে মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৩১জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট মাদারীপুরের বাংলাবাজার যাচ্ছিলো। স্পিডবোটটিতে ধারন ক্ষমতা ১৪ জনের হলেও ৩১ জন যাত্রী নেয়া হয়। এত যাত্রী নেয়ার পরেও চালক স্পিডবোটটি চালাচ্ছিলেন বেপরোয়া গতিতে। আর কন্ট্রোলবিহিীন গতিতেই শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি পুরান ঘাট এলাকায় সকাল ৭টায় সেটি বালুবাহী ট্রলারকে (বাল্কহেড) ধাক্কা দেয়। বাল্কহেডটি আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলো। এহেন পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলেই স্পিডবোট দুমড়েমুচড়ে যায়। আর এর যাত্রীরা কেউ বাল্কহেডের ওপর, কেউবা শত কিলোমিটার বেগে থাকা স্পিডবোট থেকে নদীতে তলিয়ে যায়। ঘটনার সময় বিকট শব্দ হয়।

ছুঁটে আসেন আশপাশের মানুষ। উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন তারা। ঘাটের কাছাকাছি হওয়ায় অনেককে উদ্ধার করেন তারা। কিন্তু ততক্ষনে তাদের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের শিবচর ও জাজিরা ফায়ার স্টেশন থেকে উদ্ধারকারীরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুর করে। উদ্ধারকাজে ছুটে আসেন কোষ্টগার্ড। নৌ পুলিশ ও স্থানীয় একজন ডুবুরির সহযোগিতা নিয়ে ৫ জনকে জীবিত এবং ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। নিহতদের মধ্যে ৩ জন শিশু ১ জন মহিলা এবং ২২ জন পুরুষ রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই জীবিত ৪ জনকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করেছে বলে জানা গেছে। জীবিত ৫ জন শিবচরের পাঁচচরের উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন । এখনো কতজন নিখোঁজ রয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উদ্ধার অভিযান চলমান আছে। উদ্ধার অভিযানে যোগ দিতে বরিশাল থেকে ফায়ার সার্ভিসের আরো দক্ষ ডুবুরি দল দুর্ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
এত চোখ এড়িয়ে স্পিডবোটটি চলছিল কীভাবে?
পদ্মায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা হয়। কখনো ফেরি, কখনো লঞ্চ। তবে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয় স্পিডবোট। কিন্তু স্পিডবোট উল্টে এত মানুষের মৃত্যু আগে কখনো কেউ দেখেনি। কথাগুলো বলেছেন মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটের বাসিন্দা হক সাহেব (৩৯)। তাঁর মতো অনেকেই এই মন্তব্য করেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, বেপরোয়া গতি ও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে স্পিডবোটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।

পদ্মায় স্পিডবোটে যাত্রী বহনে কোনো বৈধতা না থাকলেও এত চোখ এড়িয়ে কীভাবে এটি চলে, সে উত্তর দিতে পারলেন না বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপুলিশের কর্তাব্যক্তিরা।
শুরু থিকাই এলোমেলো স্পিডবোট চালাচ্ছিল চালক
আজ সোমবার সকালে পদ্মায় বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় এই পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ১৭ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকিদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশের একাধিক দল। স্পিডবোট দুর্ঘটনার পরই এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। তাঁদের একজন হায়দার আলী। তিনি বলেন, ‘সকালে হঠাৎ বিকট একটা শব্দ শুনেই ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে আসি। এসে দেখি স্পিডবোটটি বাল্কহেডের নিচে চলে গেছে। আর যাত্রীরা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। এর মধ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়েন স্থানীয় লোকজন। আমরা ১০ জনের লাশ উদ্ধার করি। পরে আস্তে আস্তে আরও লাশ উঠে আসে।

এত বড় ঘটনা আমার জীবনে আমি কখনো দেখিনি।’
মায়ের লাশ দেখতে গিয়ে আদুরি ফিরছেন স্বামী-সন্তানের লাশ নিয়ে
দুর্ঘটনায় উদ্ধার লাশ রাখা হয় কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের দোতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। এখানে আসেন ফরিদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশ সুপার মো. আবদুল বারেক। এ সময় তিনি বলেন, ‘লকডাউন কার্যকর থাকায় স্পিডবোট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। যে স্পিডবোট চলে তা বাংলাবাজার ঘাট থেকে চলে না। এগুলো চলে শিমুলিয়া ঘাট থেকে। আমাদের এপারের (বাংলাবাজার) ঘাটে লকডাউন কার্যকর আছে।’ তিনি আরও বলেন, পদ্মায় স্পিডবোটে যাত্রী বহনে কোনো বৈধতা নেই। তবু কেন চলাচল করছে, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর এড়িয়ে যান। এ সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ) মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শনে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, চিফ সার্ভেয়ার, চিফ পরিদর্শকসহ অনেকেই এসেছেন। লকডাউন চলার সময় এখান থেকে স্পিডবোটটি কীভাবে ছেড়ে গেল, এটা সবারই প্রশ্ন।

এত সকালে স্পিডবোট চলার বিষয় আমরা কেউ বলতে পারছি না। স্পিডবোটের কোনো নিবন্ধন নেই। তাই তারা ইচ্ছেমতো চলছে। তবে এই স্পিডবোটগুলো মানুষের সুবিধার্থে চলছে। এগুলো চলাচলে আমাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড এগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আমাদের পক্ষে কী আর করা!’
বিআইডব্লিউটিএর এই কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনার শিকার স্পিডবোটটি ২০০ সিসির। এটি ৩২-৩৪ জন যাত্রী বহন করতে পারে। এই নৌপথে চলাচলরত এটাই সবচেয়ে বড় স্পিডবোট। এই স্পিডবোটের মালিকের নাম চান্দু মিয়া ও চালকের নাম শাহ আলম। মালিকের বাড়ি শিমুলিয়া মাওয়া এলাকায়। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা পুলিশের কাছে সুপারিশ করব।’
৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনায় মাদারীপুর স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজাহারুল ইসলামকে প্রধান করে ছয় সদস্যদের তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন।

এ ছাড়া নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। লকডাউনে স্পিডবোট বন্ধ থাকার পরেও কেন এমন দুর্ঘটনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্পিডবোটটি মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে বাংলাবাজার আসে। তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্পিডবোট ছাড়ে। এসব বিষয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিরাজ হোসেন বলেন, স্পিডবোটের চালক গুরুতর আহত। তাঁকে পুলিশের নজরদারিতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালের চিকিৎসক তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্পিডবোটের চালক মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তাঁর পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ। তিনি কিছুই বলতে পারছেন না। মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন।

 

 

আপনার মতামত লিখুন :