মোঃ রবিউল ইসলাম রাব্বি (বরিশাল):
বরিশালের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতার দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে। এই মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা পরিচালনা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে দমন-পীড়ন এবং বিচার বিভাগের এক কর্মকর্তার সাথে অসংযত সম্পর্কের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বাদী দাবি করেছেন, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে আইনের শাসনের উপর জনগণের আস্থা ক্ষুন্ন হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলা সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব এবং বরিশাল ছাত্র শক্তির সংগঠক মারযুক আবদুল্লাহ ১৪ মে ২০২৫ তারিখে বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানায় জি.আর. মামলা নং ২৯৯/২০২৫ দায়ের করেন। মামলার প্রধান অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম, যিনি এর আগে বিএনপি নেতা জিয়া উদ্দিন শিকদারের দায়ের করা একটি মামলায়ও আসামি ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বরিশালের রূপাতলী এলাকায় ইয়াবা সহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। এই অবৈধ ব্যবসা চালানোর পিছনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাদেক আবদুল্লাহ, তারেক এবং কাউন্সিলর বাহারের রাজনৈতিক ছত্রছায়া কাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মারযুক আবদুল্লাহ বলেন, নজরুল ইসলাম রূপাতলী এলাকার ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। কেউ যদি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তাহলে সে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দমন করে। এমনকি স্থানীয় ছাত্র-যুবাদের উপর হামলা চালিয়ে অপরাধীদের রক্ষা করে। বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যবসা শুধু স্থানীয় যুবকদের জীবন নষ্ট করছে না, বরং সমগ্র সমাজে অপরাধের ছড়িয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, নজরুলের এই কার্যকলাপ রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের সাথে জড়িত, যার ফলে পুলিশের তদন্তে বাধা সৃষ্টি হয়।
ঘটনার আরও চাঞ্চল্যকর দিক হলো একটি গোপন ভিডিও ফুটেজ, যা বাদী সরবরাহ করেছেন। এই ফুটেজে দেখা যায়, নজরুল ইসলাম স্বীকার করছেন যে তিনি সম্প্রতি একটি মাদক সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কিন্তু বাদীর দায়ের করা এই মামলায় তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ফুটেজে আরও দাবি করা হয়েছে যে, বরিশাল আদালতের বিচারক জহিরুল ইসলাম এই জামিন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছেন। জামিন মিলার পর নজরুল বাদীর বাসায় উপস্থিত হয়ে বলেন, “আপনারা মামলা দিয়ে কিছুই করতে পারেননি। আমি তো জেলে গিয়েছিলাম মাদক মামলায়, কিন্তু আপনাদের মামলায় আমার কিছুই হয়নি।” বাদীর দাবি, সেই সময় নজরুল মাতাল অবস্থায় ছিলেন। নিরাপত্তার খাতিরে পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে ধরা হয় এবং পুলিশকে অবহিত করা হয়, কিন্তু অভিযুক্ত পালিয়ে যান।
বিচার বিভাগের সাথে যুক্ত এই অভিযোগ মামলাকে আরও জটিল করে তুলেছে। মারযুক আবদুাল্লাহ অভিযোগ করেন, “বিচার বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত স্বার্থে অপরাধীদের রক্ষা করছেন। পুলিশ তাদের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করছে, কিন্তু কিছু বিচারক ও প্রভাবশালী মহলের কারণে অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে।” গোপন ভিডিওতে নজরুলের আরেকটি বক্তব্য শোনা যায়: “জজ জহির প্রায়ই আমার অফিসে আসে, আড্ডা দেয়, কখনও কখনও মেয়েও নিয়ে আসে।” এই অভিযোগের ফলে বিচার বিভাগের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাদী জানান, তিনি এই ভিডিওটি প্রমাণ হিসেবে তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দিতে প্রন্তুত।
এদিকে, বাদী পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, “বরিশাল কোতোয়ালী থানার ওসি মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করে আসামিকে গ্রেফতার ও আদালতে সোপর্দ করেছে। এরপর আদালতের দায়িত্ব।” মামলার পর আসামিকে গ্রেফতার করা হলেও জামিন মিলে যাওয়ায় বাদীর মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
মারযুক আবদুাল্লাহর চার দফা দাবি রয়েছে: প্রথমত, ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত নজরুল ইসলামকে পুনরায় গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ; তৃতীয়ত, বিচার বিভাগে কোনো অনৈতিক প্রভাব আছে কিনা তা যাচাই করা; এবং চতুর্থত, বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
স্থানীয় ছাত্রজনতা এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। একজন ছাত্র বলেন, “যদি অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়, তাহলে জনগণের আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট হবে। আমরা চাই বরিশালে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।” বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দও এই মামলাকে তাদের বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছেন, যা রাজনৈতিক দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক।
মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য: মামলা নং—জি.আর. ২৯৯/২০২৫; দায়েরের তারিখ—১৪ মে ২০২৫; থানা—কোতোয়ালী মডেল থানা, বরিশাল; বাদী—মারযুক আবদুাল্লাহ (সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন); অভিযুক্ত—নজরুল ইসলাম, পিতা—মৃত আফছার উদ্দিন।
এই মামলা বরিশালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যদি তদন্তে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি স্থানীয় আওয়ামী লীগের চিত্রকল্পকেও প্রভাবিত করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন এখনও কোনো অফিসিয়াল বক্তব্য দেননি, কিন্তু ছাত্রনেতারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজনে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি জোরদার করবেন।