স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর স্থানীয় কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, কাজ না করেই অর্থ গ্রহণ এবং নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনের যোগসাজশে কয়েকজন অসাধু ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন না করেই মোটা অঙ্কের বিল তুলে নেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করে অসমাপ্ত রেখেই সটকে পড়েন ঠিকাদাররা। ফলে পরবর্তীতে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহা. ছামিউল হক ঠিকাদারদের গাফিলতি ও অতিরিক্ত বিল পরিশোধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিলের টাকা ফেরত নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এনএনজিপিএস-১ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম
সরকারি অর্থায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর অধীনে বাস্তবায়িত ‘নিউলি ন্যাশনালাইজড গভর্নমেন্ট প্রাইমারি স্কুল (এনএনজিপিএস-১)’ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ সদর, ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলায় ওয়াসব্লক ও টিউবওয়েল স্থাপনের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিটি কাজে ১৪-১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ৮৪৪ নম্বর প্যাকেজের ঠিকাদার রহমান এন্টারপ্রাইজ চলমান অবস্থায় ৪৫ লাখ টাকা রানিং বিল উত্তোলন করেন, যেখানে চূড়ান্ত বিল করা হয় ৩৪ লাখ টাকা।
ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলার ৮৪৫ নম্বর প্যাকেজে এক ঠিকাদার ৫০ লাখ ২৯ হাজার টাকা উত্তোলন করেন, যেখানে চূড়ান্ত বিল ছিল ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
ফুলপুর উপজেলার ৮৫৬ নম্বর প্যাকেজের ঠিকাদার মৌ কনস্ট্রাকশন অতিরিক্ত ১১ লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।
ভালুকা উপজেলাতেও একাধিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত বিল প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। পাইলাভ, সোহাল, তালাটিয়া, শিশিরচালা, বড়চালা, গোয়ারীনিলেরটেক, কাঠালী ভালুকাপাড়া, পূর্ব ভানডাব ও ফিরোজা হয়াদার স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পৃথক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পিইডিপি-৪ প্রকল্পেও প্রশ্ন
দাতা সংস্থা JICA, UNICEF ও World Bank-এর সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট-৪ (পিইডিপি-৪)’-এর আওতায় চারটি প্যাকেজে প্রতিটিতে ৭০-৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স জয়নব এন্টারপ্রাইজকে চারটি প্যাকেজে প্রায় ৯৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়। এ ঘটনায় সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীকে কারণ দর্শাতে বলা হলেও পরে তিনি দায়মুক্তি পান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিমে বিল কেলেঙ্কারি
‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে গৌরীপুর ও মুক্তাগাছা উপজেলায় কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। নির্ধারিত সময়ে অগ্রগতি ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বরেই ৬০ শতাংশ কাজ দেখিয়ে মেসার্স নূর এন্ড কোং-কে ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়।
একইভাবে ‘স্মল পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’-এর ২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে ৪৮ শতাংশ কাজের বিপরীতে ১২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়, যদিও বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৩৮ শতাংশ। পরে ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করে অবশিষ্ট কাজের জন্য অতিরিক্ত ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: অপরাধ সংবাদ, দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম