যাত্রা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কার?

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

এম মতিউর রহমান মামুন:

 

রবীন্দ্রনাথ যাত্রা শিল্পকে “জীবন্ত পুরাণ” এবং “জীবন্ত ঐতিহ্য” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন , ‘যাত্রা পালাগুলি লোক কথার মাধ্যমে সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে গেঁথে আছে’। নজরুল ইসলাম “যাত্রাপালা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন, বিশেষ করে তার “বিদ্যাপতি” নাটক অবলম্বনে নির্মিত যাত্রাপালা “অনুরাধা” এবং “মধুমালা” নামক গীতিনাট্যর ক্ষেত্রে। কবি নিজে লেটোর দলে অভিনয়ও করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যাত্রাপালায় অভিনয় না করলেও পতিসরে খোলা মঞ্চ নির্মান করে স্থানীয় শিল্পির সঙ্গে কোলকাতার শিল্পদের সমন্বয় করে ‘ভাসানযাত্রা দল গঠন করেছিলেন।
‘চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) যাত্রাগানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার সহজিয়া বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে যাত্রা ব্যবহৃত হতো’। তাহলে এটা পরিস্কার যে, যুগে যুগে যাত্রাপলা সমাজ সংস্কারের মূখ্য ভূমিকা রেখেছে ঠিক আলোর জৎস্না, আলোর ঝর্ণার মতো। স্বয়ং সত্যকে তুলে ধরে মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করেছে যাত্রাপালা। বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করার পর বাংলার মানুষের মন থেকে নবাব প্রীতি মূছে ফেলার জন্য বাঙালি ভারাটিয়া লেখক নবীন চন্দ্র সেন কে দিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে মিথ্যা নাটক তৈরি করে জোরপূর্বক যাত্রা পালাকারদের ধরে এনে নাটক মঞ্চায়ন করাতে ইংরেজরা বাধ্য করেন। নাটকের শেষ দৃশ্য নাট্যকার ও ইংরেজদের অনুগামীরা নবাবের নামে কুৎসা রটিয়ে মিথ্যা নাটক লেখার অপরাধে সাধারণ দর্শকস্রোতার জুতোপেটা খেয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয, তা বাংলার যাত্রাপালার এক বড় ইতিহাস।
আমাদের মনে রাখতে হবে ‘যাত্রা বাংলাদেশের লোকজ ও মৌলিক সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী অঙ্গ। সাধারণ মানুষের বিনোদন মাধ্যম হিসেবে যাত্রা অতীতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বিনোদনের অনেক আধুনিক মাধ্যমের প্রবর্তন এবং তরুণ দর্শক-শ্রোতাদের রুচি পরিবর্তনের কারণে এর চাহিদা কিছুটা কমেছে। যাত্রা গবেষকেরা মনে করেছেন ‘বর্তমানে যাত্রার বিষয়গত ও গুণগত অনেক রূপান্তর ঘটেছে। এখন ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক বিষয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও সমকালীন বিষয়ভিত্তিক এবং রাজনীতি ও সাহিত্যনির্ভর যাত্রাও অভিনীত হচ্ছে। আধুনিক যাত্রাশিল্পে অভিনয়, নৃত্য ও সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে বাচনভঙ্গি, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্র, সাজসজ্জা, মঞ্চ, আলোকসজ্জা ও পরিবেশসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রতিও দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে’। তবে গ্রামাঞ্চলে প্রশস্ত মাঠ বা খোলা ময়দানে হাজার হাজার দর্শক গভীর আগ্রহ সহকারে যাত্রাভিনয় উপভোগ করে। গবেষণায উঠে এসেছে ‘বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট প্রভৃতি অঞ্চলে যাত্রার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
তথ্য মতে স্বাধীনতা পরবর্তী ঢাকার করম আলী ভুঁইয়ার ‘বিজয়ল²ী অপেরা’, হবিগঞ্জের হারুনুর রশিদ খানের ‘হারুন অপেরা’, ফেনীর সেলিম চৌধুরীর ‘তরুণ যাত্রাপার্টি’, কুমিল্লার বদরুল চৌধুরীর ‘স্মরণিকা অপেরা’, খুলনার অখিলচন্দ্র দাসের ‘উত্তম অপেরা’, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালু মাস্টারের ‘বিশ্বরূপা অপেরা’, যশোরের তুষার দাশগুপ্তের ‘তুষার অপেরা’, মানিকগঞ্জের তাপস সরকারের ‘চারণিক নাট্যগোষ্ঠী’, সিরাজগঞ্জের নিরঞ্জনচন্দ্র কুন্ডুর ‘বাণীশ্রী মুক্তমঞ্চ নাট্যপ্রতিষ্ঠান’ বাগেরহাটের নুর মো. হাওলাদারের ‘বঙ্গশ্রী অপেরা’, কুষ্টিয়ার আলাউদ্দিন আহমদের ‘গীতাঞ্জলি অপেরা’, নারায়ণগঞ্জের আবদুল জব্বার ভুঁইয়ার ‘নবজাগরণ অপেরা’, গোপালগঞ্জের ধীরেন্দ্রকুমার বাকচীর ‘নব দীপালি অপেরা’ ও ‘দীপ দীপালি অপেরা’ এবং চট্টগ্রামের ললিতমোহন ঘোষের ‘নবারুণ নাট্যসংস্থা’ নাম করা দল হিসাবে বেশ খ্যাতি ছিল’। ৮০ দশকে বাংলাদেশের যাত্রাপালায় স্বপন কুমার, অশোক কুমার, নায়িকা চন্দ্রা ব্যানার্জীর মতো গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা যাত্রাপালায যা রেখে গেছেন তা আমাদের জন্য আশির্বাদ। সে সময গ্রামগঞ্জের নারী পুরুষ উভয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে যাত্রাপালা দেখতে যেত। সমাজিক, ঐতিহাসিক, পৌরাণিক পালা দেখে ভোররাতে অশ্রæশিক্ত চোখে বাসাতে ফিরতো। মাঝখানে কী এমন ঘটেছে যে, বাংলার আদি সংস্কৃতির পচন ধরলো? নাকি অশ্লীলতার তকমা লাগিয়ে পচন ধরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে তা একবার ক্ষতিযে দেখা দরকার। আমি যাত্রাপালায় কোন অশ্লীলতা দেখিনা বরং পালা শুরুর পূর্বে কিছু অসাধু ব্যাক্তি তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মেয়েদের কাটাপোষাকে নাচানোর চেষ্টা করে এবং একটি মহল তাতে রঙ চং মেখে প্রচার করে সেটাই হয়ে যায় অশ্লীল। উঠতি বয়সের তরুণ ছেলেদের হাতে নীলছবি সংগত কারনে তারা পালা দেখতে গিয়ে নাচের শিল্পীদের হাতে দু’টো টাকা দিয়ে খোলা পোশাকে নাচ দেখতে চান, তখন তা হয়ে যায় অশ্লীল। রাজা তাঁর মসনদে বসে রাজ্যে শাসনের নামে কিভাবে রাজ্যে শোষন করে, একজন সমাজ পতি কিভাবে সমাজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অন্যায় অবিচার করে যাত্রা পালায় শেষাংশে এই মহা সত্যের প্রকাশ ঘটে যা একটি মহল মেনে নিতে পারেনা এটাও একটা কারন। এমন সত্য উন্মোচন করাই কী যাত্রাশিল্পের অপরাধ?
যা হোক বর্তমানে যাত্রা শিল্পের অবস্থা বেশ নাজুক দূরাবস্থা বলা যেতে পারে । অনেক শিল্পী জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, বিশেষ করে নারী শিল্পিরা অভাবের তাড়নায় কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছেন। দুঃখের বিষয় কিছু নারী শিল্পী অসাধুর খপ্পরে পরে পাচার হয়েছেন। কিছু গুণীশিল্পী যাত্রা শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টাও করছেন।
ভাবতে কষ্ট হয় শিল্পরা দু’বেলা খাবার জোগাড় করতে পারছেনা অনেক শিল্পী’রা কোলের শিশুদের দুধ কিনে দিতে পারছেন না। যাত্রা শিল্পের প্রদর্শনী কমে যাওয়াতে এমন আর্থিক সংকট। তারপর জেলা প্রশাসক যাত্রার পরামিশন দেওয়া নিয়ে গড়িমসি বা পারমিশন না দেওয়া এবং উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে যাত্রা শিল্পী’রা এক কঠিন সময় পার করছে। অথচ ‘যাত্রা উন্নয়ন নীতিমালা ২০১২’ আর্টিকেল ৮- পারমিশন এ বলা হয়েছে ‘ কোন স্থানে যাত্রা প্রদর্শন করিতে হইলে পূর্বেই স্থানীয় জেলা প্রশাসনের অনুমতি লইতে হইবে। অনুমতির জন্য আবেদনপ্রাপ্তির ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্য জেলা প্রশাসককে অনুমতির বিষয়টি নিস্পত্তি করিতে হইবে। মৌসুমে অনুমতিজনিত প্রশাসনিক জটিলতায় যাত্রা পরিক্রমা যাহাতে বন্ধ না হয় সেই বিষয়ে জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করিবেন’। এমন রাষ্ট্রীয় আদেশ থাকার পরেও পারমিশন দিতে গড়িমসি কেন তা বোধগম্য নয়।
বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বৈধ রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত দলের প্রায় ১৭১ টি তাতে হাজার হাজার শিল্পী একদম বেকার তাদের জীবন ও জীবিকার কথা রাষ্ট্রের ভাবতেই হবে কারন তাদের বাঁচার অধিকার আছে। আমরা আশাবাদী বর্তমান সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব তিনি সামনের পূজার সিজন থেকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নিরলস অনুশীলন ও চর্চার লক্ষে গ্রাম বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য ধারক বাহক যাত্রাদলের পারমিশন দিবেন। কোটি টাকা ফুরিয়ে শুধু ঢাকায় শিল্পকলাএকাডেমিতে দু’চারটা পালা করে ইতিহাস রক্ষা হবেনা এবং লক্ষাধিক যাত্রাশিল্পিদের পেট ভরবেনা। বিধায় ‘যাত্রা উন্নয়ন নীতিমালা অনুসারে মৌসুমে যাত্রাদলের পারমিশন নিশ্চিত করতে হবে।

লেখকঃ রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক, গবেষক ও কলাম লেখক।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ

বিজ্ঞাপন