যাত্রী সংকটে শতাধিক পরিবহন বন্ধ যশোর করোনা পরিস্থিতিতে কর্মচারীদের বেতন অর্ধেক

মির্জা বদরুজ্জামান টুনু,যশোর

যশোরে করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকামুখী তিনটি পরিবহন। এছাড়া অন্যান্য পরিবহনের শতাধিক বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ নিয়ে পরিবহন সেক্টরে বিরাজ করছে হাহাকার। যাত্রী সংখ্যা কমে চার ভাগের একভাগে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে মাত্র পঁচিশ ভাগ পরিবহন যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। একটি পরিবহন কর্তৃপক্ষ শহরে তাদের দুটি কাউন্টার বন্ধ করে দিচ্ছে। অপর একটির স্টাফদের ছাঁটাই না করে বেতন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। যা নিয়ে শ্রমিকদের মাঝে রীতিমত হতাশা দেখা দিয়েছে। সূত্র জানায়, দেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ও ১৮ মার্চ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে করোনা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ও মহামারি আকার ধারণ করে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

এরই অংশ হিসেবে ২৬ মার্চ থেকে দেশে লকডাউন ঘোষণা করে গণপরিবহন চলাচল ও অফিস আদালত বন্ধ করা হয়। গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাবার পর এ সেক্টরের শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তারা বেকার জীবন কাটাতে থাকেন। এ অবস্থা দু’মাস অতিবাহিত হবার পর ১ জুন থেকে সরকার ফের গণপরিবহন ও অফিস আদালত খুলে দেয়। কিন্তু এতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। দেশে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৭ জুন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ১ হাজার ৬৯৫ জন ও আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭৮ জন। এ পরিস্থিতিতে যশোর জেলার অবস্থাও ভয়াবহ। যশোরে আক্রান্তের সংখ্যা ৫শ’ ছাড়িয়েছে ও মৃত্যুবরণ করেছে দশজন। মানুষ জরুরি প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছে না।

ঢাকা বা অন্য কোনো জেলায় যাতায়াত করছে না বললেই চলে। এ কারণে গণপরিবহনে ভয়াবহ যাত্রী সংকট দেখা দিয়েছে। পরিবহন শ্রমিক সূত্র জানায়, বর্তমানে ২৫ ভাগ পরিবহন যাত্রী নিয়ে যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। বাকি ৭৫ ভাগ গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতির আগে দিন-রাত মিলে ঈগল পরিবহন যশোর থেকে প্রতিদিন গাড়ি ছাড়তো ৩৫ থেকে ৪০টি। হানিফ এন্টারপ্রাইজ একই সংখ্যক গাড়ি ছাড়তো ও সোহাগ পরিবহন ছাড়তো ৪০ থেকে ৪২টি গাড়ি। এছাড়া সাতক্ষীরাসহ অন্যসব পরিবহন মিলে ছাড়তো আরও ২৫টি গাড়ি। গড়ে প্রতিদিন যশোর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের উদ্দেশ্যে দেড় শতাধিক পরিবহন ছেড়ে যেতো। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা নেই। এখন দিন-রাতে সব পরিবহন মিলে গড়ে ছেড়ে যাচ্ছে ৪০টি গাড়ি। বাকি শতাধিক গাড়ি বসে থাকছে। এসব পরিবহনের শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়েছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। যাত্রী না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে পরিবহন সূত্র জানিয়েছে।

এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র সোহাগ পরিবহনে ২টি ও গ্রীণলাইন পরিবহনে ১টি এসি বাস চলাচল করছে। বন্ধ হয়ে গেছে যশোর থেকে ঢাকাগামী তিনটি পরিবহন সার্ভিস। এগুলো হল দেশ ট্রাভেলস, রয়েল ট্রাভেলস ও সেন্টমার্টিন পরিবহন। এরমধ্যে একে ট্রাভেলস কর্তৃপক্ষ তাদের মণিহার বাসস্ট্যান্ড ও গাড়িখানা রোডের কাউন্টার আগামী ১ জুলাই থেকে বন্ধ করে দিচ্ছে। তারা শুধুমাত্র খাজুরা বাসস্ট্যান্ড কাউন্টার খোলা রাখছে। এসব কাউন্টারের শ্রমিকদের চাকরি অনিশ্চিত বলে সূত্রটি জানিয়েছে। এছাড়া, হানিফ এন্টারপ্রাইজ চলতি মাসে তাদের কর্মচারী ছাটাইয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর ঢাকায় কোম্পানির মালিক শ্রমিকদের মাঝে বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয়েছে কর্মচারী ছাটাই করা হবে না। তবে কর্মচারীদের বেতন আগামী ১ জুলাই থেকে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। এ অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে চরম হতাশায় দিনাতিপাত করছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

আগামী দিন তাদের কিভাবে কাটবে তা নিয়ে তারা চোখে অন্ধকার দেখছে। এ নিয়ে ঈগল পরিবহনের যশোর কাউন্টার কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, গাড়িতে এখন কোনো যাত্রী নেই। আগে প্রতিদিন তাদের ৩০ থেকে ৪০টি গাড়ি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়েছে, কিন্তু এখন যাচ্ছে ৮/১০টি। এ ব্যাপারে হানিফ এন্টারপ্রাইজ যশোরের ম্যানেজার এএসএম তসলিম বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে যাত্রী সংকটে বর্তমানে তাদের ২৫ ভাগ গাড়ি চলছে। বাকি ৭৫ ভাগ গাড়ি বসে রয়েছে। তারমধ্যে অধিকাংশ গাড়ি ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে মালিক পক্ষ প্রতিদিনই লোকসান গুনছে। যাত্রী যদি ২০ জন হতো তবুও মালিক পক্ষ লাভের মুখ দেখতো, তারাও দাবি নিয়ে মালিকের সামনে যেতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদেরকে থমকে দিয়েছে। আগামী দিনে পরিবার নিয়ে তাদের কী হবে সেটাও অজানা।

যশোর পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোর্ত্তজা হোসেন বলেন, করোনা মহামারিতে শ্রমিকরা দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন। অধিকাংশ শ্রমিক এখন বেকার। গাড়ির চাকা না ঘুরলে তাদের পেটে ভাত আসবে না। যশোরাঞ্চলের ১৮টি রুটে তাদের বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের অর্থিক সহযোগিতা করার মত ক্ষমতাও তাদের নেই। এ কারণে শ্রমিকদের নিয়ে তারা চিন্তিত সময় কাটাচ্ছেন। এসব ব্যাপারে যশোর ঈগল পরিবহনের কর্ণধার পবিত্র কাপুড়িয়া বলেন, তার ব্যবসা জীবনে এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতি তিনি আগে কখনো দেখেননি। লোকসান দিয়ে তাদেরকে এখন ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। এভাবে পরিবহন ব্যবসা কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারবেন তা নিয়ে তারা চিন্তিত হয়ে উঠেছেন।

এ ব্যাপারে কথা হয় যশোর বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আলী আকবরের সাথে। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে তাদের পরিবহন ব্যবসা বন্ধ হবার পথে। গাড়িতে কোন যাত্রী নেই। গাড়ি চালাতে গিয়ে তাদের খরচ উঠছে না। পকেট থেকে স্টাফদের খোরাকির টাকা দিতে হচ্ছে। এছাড়া তাদের বেশি ক্ষতি করছে অবৈধ যানবাহনগুলো। ওইসব গাড়ি যাত্রী নিয়ে মহাসড়ক, সাবসড়ক ও শহরে চলাচল করছে। এ কারণে যাত্রীরা বাসের জন্য দাড়িয়ে থাকছে না। আগামী মাসে তারা এসব বিষয়ে প্রশাসনের সাথে বৈঠক করে পরিবহন ব্যবসা করবেন কিনা তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান।

আপনার মতামত লিখুন :