শ্রমজীবী মানুষের হাহাকার “খাব কী ঘরে খাবার নেই”

উমর ফারুক আলহাদী

করোনায় ঘরবন্ধী শ্রমজীবী মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী কেনা তো দুরের কথা ঘরের খাবার কেনারেই টাকা নেই। খাদ্য সংকটে পড়া কর্মহীন শ্রমিকদের ঘরে ঘরে হাহাকার। বাজারে খাদ্য থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য নেই তাদের। ফলে, এসব পরিবারগুলোর বেশিরভাগই এখন ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে, পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে তারা ত্রাণ বঞ্চিত। সরকার যে দশ কোটি টাকা গরবীদের ত্রাণ হিসাবে দিতে যাচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। সাড় পাঁচ কোটি গরীব মানুষকে দিলে একজন দুই টাকা করে পেতে পারেন। এই হটিল পরিস্থিতিতে পড়ে অসহায় কর্মহীন মানুষেরা বলছেন, “ খাব কী ঘরে খাবার নেই।” রাজধানীর উত্তরার আবদুল্লাপুর আজমপুর খিলক্ষেত মিরপুর ও গাবতলী এলাকায সরেজমিনে ঘুরে কর্মহীন শ্রমজীবী ও ভাসমান মানুষের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। উত্তরা আজমপুর রেল লাইনের পাশে শনিবার সকাল ৯ টা বসেছিলন ৪-৫ জন। তাদেও হাতে মাটি কাটার কোদাল এবং মাটি বহনের টুকরী। তাদের একজন আব্দুল খালেক। বয়স ৩৪ কি ৩৬ হবে।

বাড়ি দিনাজপুর। তিনি জানালে পুলিশের বিধি নিষেধ উপেক্ষা করে গত ৫ দিন ধরে সকাল ৮ টাকা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত কাজের জন্য সেখানে অপেক্ষায় থাকেন। কিন্ত কাজ মিলছে না। হাতে টাকা নেই খাবর কিনার টাকা নেই। বাড়িও যেতে পারছেন না লকডাউনের কারণে। খালেকের সঙ্গী রুবেল জানায়, লকডাউনের মাঝেও কাজের সন্দানে প্রতিদিন সেখানে অপেক্ষা। করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি নিয়েই ঘরের বাইরে আসতে হয় আয় রোজগারের জন্য। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, খাব কী ঘরে খাবার নেই। কাজ না করলে পকেটে কেউ টাকা দিবে না। তাদের মতো আরো অনেকেই কাজের সন্দানে প্রতিদিন ভিড় করেন আবদুল্লাপুর ও
তার পাশপাশ এলাকায়। কিন্ত তারা কোন কাজ পাচ্ছেন। গাবতলী বাস টার্মিনালে কথা হয় রাজমিস্ত্রি রাজু মিয়ার সাথে। চল্লিশ বছর বয়সী রাজু মিয়া জানান, তিন মেয়ে এক ছেলে ও স্ত্রীসহ ছয় সদস্যেও পরিবার তার। বড় ছেলে মামুনকে নিয়ে তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। কিন্তু করোনার কারণে গগত ১৫ মাস ধরে কোন কাজ নেই। মিরপুর কালসী এলাকায় দুই
রুমের টিনসেট ঘরে ভাড়া থাকেন।

পূর্বের জমানো টাকা দিয়ে ছয় মাস কোন রকম খেয়ে না খেয়ে কাটিয়েছেন। তারপর ছয় মাস ধার দেনা করে খাবার জোগাড় করেছেন। কাজকর্ম না থাকায় গত দুই মাস ধরে পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন। তিনি আরো জানান, ইতোমধ্য তিন মাসের ঘর ভাড়া ১২ হাজার টাকা বকেয়া পড়েছে। পাওনাদার ও বাড়িওয়ালার চাপে তিনি এখন দিশে হারা। পকেটে টাকা নেই ঘরে খাবার নেই। তিনি
জানান, তার জাতীয় আইডি কার্ড গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ঠিকানায়। তাই রাজধানীতে কোন ত্রাণও পাচ্ছেন না। রাজু তার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। রাজুর মতো কষ্টের কথা জানালেন রং মিস্তিরি কামাল হোসেন। টাঙ্গাইলের ছেলে কামাল তার বৃদ্ধ মা স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন মিরপুর রূপনগর এলাকায়। কামাল জানান, দুই মাস ধরে কোন কাজ নেই। গ্রামের বাড়িতেও যেতে পারছেন না
পাওনাদারদের ভয়ে। গ্রামের সমিতি থেকে ১৫ হাজার টাকা লোন নিয়ে ছিলেন। সুদে আসলে এখন ২২ হাজার টাকা দেনা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকাতে শ্রমজীবী মানুষেরা এখন সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন । নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষও অর্থ সংকটে পড়েছেন।

করোনার কারণে সবাইকে ঘরে বন্দী থাকতে হচ্ছে। তাই বন্ধ হয়ে গেছে আয়ের পথও। অর্থের অভাবে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শ্রমিকদের। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে পরিবার পরিজন নিয়ে। কারো ঘরে আটা আছে তো চাল নেই, আবার কারো ঘরে চাল আছে তো তরকারি নেই। এভাবে চরম খাদ্য সংকটে দিন পার করছেন কর্মহীন শ্রমিক পরিবারগুলো। রাজনীতিবিদ অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মিদের পরামর্শ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের বলেছেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে লকডাউনের সুফল অর্জন সম্ভব নয়। দেশের কোটি কোটি মানুষ দিন এনে দিন খায়। তাই জীবন বাঁচাতেই তাদেও রাস্তায় নামতে হয়।’ তিনি খেটে খাওয়া মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণ বিতরণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউনে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে চাপা হাহাকার উঠেছে। নিম্নআয়ের মানুষ কর্মহীন হয়ে অসহনীয় কষ্ট পোহাচ্ছে। এদিকে মানবাধিকার কর্মী নুর খান বলেছেন . করোনা মহামারিকালেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গরীব মানুষেরা। খাদ্য চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার
থেকে চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন ।

এমন কি পাচ্ছেন না ত্রাণ সামগ্রী। অন্য দিকে অতি ধনী ও উচ্চভবিত্ত ধনীরা আরো অধিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। ফলে শ্রেণী বৈষম্য আরো প্রকট হচ্ছে। লকটাউনের কড়াকড়ি এবং কাজকর্ম হারিয়ে শ্রমজীবী গরীব মানুষেরা এমনিতেই দিশেহারা। তারপরে আছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ। পরিবারের সদস্যদের জন্য দু’বেলা খাবারও জোগাতে পারবেন না তারা। অন্যদিকে ধনী প্রভাবশালী শিল্পপতি ও এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী নামধারী প্রভাবশালী চক্র ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপী হয়েও পাচ্ছে করোনাকালী নানা সুযোগ সুবিধা। পাচ্ছেন প্রণোদনার সুবিধা। করোনার বিস্তার রোধে চলমান লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত, দরিদ্র, অসচ্ছল মানুষের জন্য সাড়ে ১০ কোটি টাকা সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণাকৃত এই অর্থ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা করার দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী দেশে পাঁচ কোটি গরিব মানুষ রয়েছেন। সাড়ে ১০ কোটি টাকা তাদের মধ্যে ভাগ করা হলে জনপ্রতি পাবেন দুই টাকা করে। অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি প্রত্যেক দিন খারাপ হচ্ছে। সামনে ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

এখন এ পরিস্থিতিতে মানুষের সঞ্চয় যা ছিল, তা ফুরিয়ে গেছে। কর্মহীন মানুষের অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী গরিব মানুষের জন্য সাড়ে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব মতে, কমপক্ষে আমাদের দেশে এখন পাঁচ কোটি গরিব মানুষ আছে। সাড়ে ১০ কোটি টাকা ভাগ করলে তারা দুই টাকা করে পাবেন।’ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘দরিদ্র মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী সাড়ে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। এতে প্রতিটি পরিবার একটি বা দুটি পেঁয়াজু পাবে। এটা সাধারণ অসহায় মানুষের সঙ্গে মস্করা।

 

আপনার মতামত লিখুন :