সদরঘাটে লঞ্চ ডুবি নিহত-৩২ অনেকে নিখোঁজ পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন দশ সেকেন্ডে সব শেষ

সোহেল রানা শুভ

কেবিনে দুই মামাসহ আমরা তিন জন। হঠাৎ ঘাটের দিক থেকে পেছনে আসা লঞ্চ আমাদের লঞ্চকে সজোরে ধাক্কা দেয়। আমাদের লঞ্চটি কাত হয়ে যায়। আমি কেবিনের জানালা দিয়ে পানিতে ঝাপ দেই। কিন্তু লঞ্চটি ডুবতে সময় নেয় ১০ সেকেন্ডেরও কম। দুই মামাসহ শতাধিক যাত্রী আটকে পড়েন লঞ্চের ভেতরে। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চ ‘মর্নিং বার্ড’ থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী দূর্ঘটনা সম্পর্কে এভাবেই বর্ননা করেন। ভয়াবহ এ দূর্ঘটনায় গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ডুবুরিরা। এখনো পর্যন্ত কতজন নিখোঁজ রয়েছেন সে সম্পর্কে ধারনা নেই কারো। লঞ্চটিতে অন্ততঃ দেড়শ’ যাত্রী ছিলো বলে ধারনা করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিøউটিএ) কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই লঞ্চের কর্মীদের অসতর্কতায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মর্মান্তিক এ লঞ্চডুবির ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডবিউটিএ। একই ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

এদিকে মর্মান্তিক এ লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। এদিকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। লঞ্চ ও লাশ উদ্ধারে নৌপুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিআইডবিøউটিএ ও থানা পুলিশ একযোগে কাজ করছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চের ভেতরে আরো লাশ রয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষ্যদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে মর্নিং বার্ড নামের একটি যাত্রীবাহি ছোট লঞ্চ ঢাকায় আসছিল। সকাল ৯টার দিকে ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চের সঙ্গে এর সংঘর্ষ হয়। এ সময় মনিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়।

লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শী মাসুদ বলেন, রাজধানীর ইসলামপুরের গুলশান আরা সিটিতে কাপড়ের ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিন তিনি সকালে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে কাপড়ের দোকান করেন। গত রোববার ময়মনসিংহ থেকে তার দুই মামা আফজাল শেখ ও বাচ্চু শেখ তাদের মুন্সিগঞ্জের বাসায় বেড়াতে যান। তাদের নিয়ে গতকাল সোমবার সকালে লঞ্চের একটি কেবিনে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। কিন্তু লঞ্চ পাড়ে ভেড়ার আগে মুহূর্তে লঞ্চ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

গতকাল দুপুরে সদরঘাটের জেটিতে অবস্থান করা মাসুদ আরো বলেন, ‘ঘাটে ভেড়ার জন্য আমাদের লঞ্চ সোজা আসছিল। অন্য একটা লঞ্চ তেছড়াভাবে (বাঁকা) রওনা দিছে। তেছড়াভাবে রওনা দেয়াতে ওই লঞ্চটা বাড়ি দিছে আমাদের লঞ্চের মাঝে। বাড়ি দেয়ার সাথে সাথে লঞ্চটা কাইত হয়ে ডুবে গেছে। তলায় যেতে ১০ সেকেন্ডও সময় নেয় নাই। আমি কেবিনে ছিলাম।  আমি জানালা দিয়ে বের হইছি। ভেতরে থাকা দুই মামা বের হতে পারেন নাই। তাদের খোঁজ করছি।’ তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর লঞ্চে থাকা ৫০ জনের মতো যাত্রী আমরা সাঁতরে উঠতে পারছি। বাকি যাত্রী কেউ উঠতে পারে নাই। তারা লঞ্চের ভেতরেই ছিল। আমরা প্রায় ১৫০ জনের মতো লোক ছিলাম।

লাশ তুলে শেষ করতে পারছেন না ডুবুরিরাএকের পর এক লাশ। কিছুক্ষণ পরপরই একেকজন ডুবুরি লাশ নিয়ে পানির ওপর ভেসে উঠছেন। বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনাস্থলে একসঙ্গে ৪-৫ জন ডুবুরি উদ্ধার কাজ করছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, লাশ তুলে তারা যেন শেষ করতে পারছেন না। ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, নৌপুলিশ, থানা পুলিশ ও স্থানীয়রা। এখনও নিখোঁজ রয়েছে অনেকে। নিখোঁজদের স্বজনরা বুড়িগঙ্গার তীরে এসে ভিড় করেছেন। রাজ্জাক নামে একজন বলেন, তার বোনজামাই মুন্সীগঞ্জ থেকে সকালে ঢাকায় আসার কথা। এখনও তার কোন সন্ধান পাননি। সিদ্দিক নামে এক যুবক বলেন, তার মামা কালাম নিখোঁজ। তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। কোস্টগার্ড সদর দফতরের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার হায়াৎ ইবনে সিদ্দিক বলেন, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের উদ্ধার অভিযান চলমান।

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ৮ জন নারী ও তিনটি শিশু রয়েছে। উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেওয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘লঞ্চের ভেতরে অনেক লাশ রয়েছ। আমরা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালাবো। নদীর নিচে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। আমাদের সঙ্গে নৌপুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিআইডবিøউটি ও থানা পুলিশ কাজ করছে। গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, এ দূর্ঘটনায় নিহতের প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেয়া হবে। এছাড়া লাশ দাফনের জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। তিনি জানান, এছাড়া সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয় হয়েছে।

বিআইডবিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জানান, ধাক্কা দেওয়া লঞ্চ ময়ূর–২ জব্দ করা হয়েছে। তবে লঞ্চের চালক পালিয়ে গেছেন। বিআইডবিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঘটনাস্থলের দিকে আসছে। তবে লঞ্চডুবির ঘটনার পরপরই নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় রওনা দিলেও বিকেল বিকেল পর্যন্ত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছেনি জাহাজটি। তবে উদ্ধারকারী এ জাহাজটি ঘটনাস্থলে আসার পথে পোস্তগোলা ব্রিজের নিচে আটকে গেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় জাহাজটি আসতে পারছে না। উদ্ধারকারী জাহাজ এখনও ঘটনাস্থলে না পৌঁছতে পারায় সনাতন পদ্ধতিতে উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ ভোর সাড়ে ৪টার দিকে লালকুঠী ঘাটে যাত্রী নামিয়ে সদরঘাটের চাঁদপুর ঘাটে গিয়ে নোঙ্গর করার জন্য ব্যাক গিয়ারে ঘুরছিল। ওই সময় পেছনে নদীতে থাকা এমভি মর্নিং বার্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।এদিকে দুর্ঘটনার পর হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে ভিড় করেন। মর্নিং বার্ডের নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে ঘাটে আসা স্বজনদের বিলাপ করতে দেখ যায়।
ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা যেসব লাশ উদ্ধার করেছেন, তাদের মধ্যে যমুনা ব্যাংকের ইসলামপুর শাখার কর্মচারী সুমন তালুকদারকে শনাক্ত করেন তার বড় ভাই নয়ন তালুকদার। তিনি জানান, তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে।

প্রতিদিন বাড়ি থেকে এসে পুরান ঢাকার ইসলামপুরে অফিস করতেন সুমন। প্রতিদিনের মত সকাল সাড়ে ৭টার দিকে লঞ্চে উঠে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন এক সন্তানের বাবা সুমন। পরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এবং তার ফোন বন্ধ পেয়ে সদরঘাটে ছুটে আসেন তার ভাই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিøউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক সাংবাদিকদের বলেন, দুই লঞ্চের কর্মীদের অসতর্কতায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে তারা মনে করছেন। উদ্ধার অভিযান শেষে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হবে। উদ্ধারকৃত লাশগুলো দুই দফায় রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ডে) হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সেখান থেকেই লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়, সরকার প্রধান লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন :