সম্পাদকদের বিরুদ্ধে মামলা : স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত

স্টাফ রিপোর্টার

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দেশের জনপ্রিয় গণমাধ্যমের দুই সম্পাদক ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘সত্য প্রকাশ এবং মানুষের জানার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করতেই এ ধরনের মামলা করা হয়। মোট কথা, প্রকারান্তরে এটি দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করবে।’

ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দেশের জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার ও বিডি নিউজের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁওয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার বিষয়ে করা এক প্রতিক্রিয়ায় সোমবার (২০ এপ্রিল) এসব কথা বলেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মোমিনুল ইসলাম ভাসানী এই মামলাটি করেন।

তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীদের নেতা এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যমে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার পর যদি সাংবাদিক-সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, তাহলে কোনো মানুষই কোনো খবর প্রকাশ করবে না।’

‘আমি মনে করি, এ ধরনের পদক্ষেপ স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর যেমন আঘাত, তেমনি মানুষের সঠিক সংবাদ পাওয়ার অধিকার হরণের নামান্তর। এভাবে মামলা হলে সঠিক মানুষকে সংবাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করবে।’

চাল চুরির ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ  বলেন, ‘ত্রাণের চাল চুরির সংবাদ মিডিয়াই প্রকাশ করার ভিত্তিতে যারা জড়িত তাদের মধ্য থেকে একজন থানায় গিয়ে অনলাইন পোর্টালের সম্পাদকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এই সংবাদে আমরা অত্যন্ত আতঙ্কিত। কারণ এই যে বর্তমান সরকারও বলেছে, যারা ত্রাণের চাল চুরির সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।’

চাল চুরির সাথে যারা জড়িত, সেক্ষেত্রে তারা যদি সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে এটা হবে আইনের অপব্যবহার। তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগেই বলেছিলাম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার হবে। এই আইনটা সংবিধানের পরিপন্থী। ত্রাণ আত্মসাৎকারীর পক্ষে আইসিটি অ্যাক্টে মামলা করা ক্ষমতার অপব্যবহার।’

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা দুঃখজনক। সাধারণ মানুষের মনে আরও জায়গা করে নেবে। এটা চ্যালেঞ্জ হলে পরে এই আইন নিয়ে ভবিষ্যতে আরও টানাটানি শুরু হবে। ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমে মানহানির বিষয়ে এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের সাংবাদিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকর্মীদের মামলা নেয় না থানা। তারা বলেন, আপনারা কোর্টে যান।’

তিনি দেশের পুলিশ প্রধানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এ চাল চুরির ঘটনার পর কেউ যদি কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে আসেন, এ বিষয়ে যেন সারাদেশের থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) প্রতি একটি নির্দেশনা দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। চাল চোরের পক্ষে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা নেয়ার বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে যেন নেয়। তাহলে চোরের পক্ষে আর কেউ মামলা করার সাহস দেখাবে না।’

সরাসরি থানায় গিয়ে সম্পাদক-সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাকে চাল-গম চোর ও দুর্নীতিবাজদের উৎসাহ দেয়ার ‘অভিনব পদ্ধতি’ বলে উল্লেখ করেছেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলেন, ‘আইজিপির মাধ্যমে এই সব পুলিশ অফিসারদের সুনির্দিষ্টভাবে একটা নির্দেশনা দেয়া দরকার, যাতে তারা সংবাদমাধ্যমের কারও বিরুদ্ধে অর্থাৎ সংবাদ প্রকাশের কারণে মামলাগুলোর ব্যাপারে তড়িঘড়ি করে এফআইআর না করে। কারণ একটা এফআইআর হয়ে যাওয়ার পর কিন্তু একজন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান আইনগত সমস্যায় পড়তে পারেন।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে, যদি কোনো সংবাদ পরিবেশিত হয় কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে, আর সেটা যদি মিথ্যা হয়, কেবলমাত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, কারো মান-সম্মানহানী করা হয়, সেটা কিন্তু মিথ্যা হতে হবে।

যদি সত্য হয় তখন ডিজিটাল নিরাপত্তার এই আইনের প্রয়োগ করা যাবে না। যদি অসত্য তথ্য হয় মিথ্যা হয়, ষড়যন্ত্রমূলক হয় তাকে হেয় করার জন্য করা হয়, উদ্দেশ্যমূলক হয় তাহলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ এর (২) খ স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।

তবে, কিছু যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সেটা সংবিধানের ৩৯ এর (ক) এ বলে দেয়া হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইন-শৃঙ্খলা যেন হয়। কোনো ধরনের পরিস্থিতির যেন উস্কে না দেওয়া হয়। কোন ধরনের মানহানি ও আদালত অবমাননা যেন না হয়। এখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা হয়েছে সংবিধানে।

তিনি বলেন, সাংবাদিক হিসেবে যদি কোনো তথ্য পরিবেশন করে থাকেন, সেটা তথ্য অধিকার আইনেও মানুষের জানার অধিকার রয়েছে যে কোথায় কি ঘটছে। আর যদি ঘটনা সত্য হয়ে থাকে, চাল চুরি বা ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম, যদি সত্য হয়ে থাকে এটা সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব এটা প্রচার করা, আর মানুষ হিসেবে অধিকার রয়েছে আমার জানার। আমাদের দুর্যোগকালীন যে ত্রাণ ব্যবস্থাপনা হচ্ছে এটা কতটুকু সঠিকভাবে হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে? যদি ঘটনা সত্য হয়ে থাকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য হয়ে থাকে, এটা তাদের পেশাগত কাজ। এটা যদি সত্য ঘটনা হয় তাহলে সাংবাদিক সঠিক করেছে।

তিনি বলেন, ত্রাণ বা চাল চুরির অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে স্থানীয় প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে বা উপযুক্ত শাস্তি দিবে অথবা তাদের জাড়িতদেকে বহিষ্কার করবে

এদিকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীসহ অন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ মামলার নিন্দা প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি ওয়াকিল আহমেদ হিরণ।

এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমরা সাংবাদিকরা সবসময়ই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই রিপোর্ট করি। কিন্তু মামলা করা হলো। আসলে এটা খুবই দুঃখজনক। আমার মনে হয়, মামলাটি অবশ্যই প্রত্যাহার করা উচিত। যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তদন্ত সাপেক্ষে তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’

এলআরএফ সভাপতি ও দৈনিক সমকালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ওয়াকিল আহমেদ হিরণ বলেন, ‘কিছু লোক তো এসব করছেই। বেশিরভাগই সরকারের লোকজন বা সরকার সমর্থিত লোকজন। আমি আশা করি, তারা মামলাটা প্রত্যাহার করবে। সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

দৈনিক সমকালের এ জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বলেন, ‘রিপোর্টে যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তারা প্রতিবাদ জানাতে পারে, আমরা সংশোধনী ছাপাবো। এমনকি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ারও সুযোগ আছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার পর আমরা যদি ভুল সংশোধন না করি, তাহলে আপনি আমার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘সেজন্য প্রেস কাউন্সিল আছে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আছে। কিন্তু হঠাৎ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে দেয়া আমাদের কাজের স্পৃহাকে বাধাগ্রস্ত করা এবং এটি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে আমি মনে করি।’

এ বিষয়ে ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি অবজারভারের সিনিয়র করেসপনডেন্ট নাজমুল আহসান রাজু জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাংবাদিকের কাজ হলো সত্য প্রকাশ করা। যদি সত্য প্রকাশ করে সেটা কারও না কারও বিরুদ্ধে যাবেই। সেখানে যদি তথ্যে ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তারা প্রতিবাদ জানাতে পারে, সংশোধনী দিতে পারে। এমনকি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার পর যদি ভুল সংশোধন না করে, তাহলে আইনগত ব্যব্স্থা নিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘প্রেস কাউন্সিল আছে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আছে। কিন্তু প্রেস কাউন্সিলে না গিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে দেয়া অন্যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে কালো আইন, নিপীড়নমূলক আইন। এ আইন মূলত সাংবাদিকদের ওপর ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কালো ও অন্যায়মূলক এই আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে। আমি মনে করি, সরকারের এই আইন সংস্কার করা উচিত।’

আপনার মতামত লিখুন :