‘সাতৈর শাহী মসজিদ’ ঘিরে যত জনশ্রুতি

ফরিদপুর প্রতিনিধি

ফরিদপুরের বোয়ালমারীর সাতৈর অঞ্চলে আরব থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন অসংখ্য ইসলাম প্রচারক, তাদের মধ্যে ১২ জনের বিশেষ পরিচিত রয়েছে। তাদের নাম ঘিরেও রয়েছে জনশ্রুতি। এখনও ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে ভক্তিভরে স্মরণ করা হয় এসব আউলিয়াদের নাম। তাদের প্রচেষ্টায় অথবা সম্মানে (কেউ বিষয়টি নিশ্চিত নন) প্রায় ৪০০-৫০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নে অবস্থিত ‘সাতৈর শাহী মসজিদ’।
অনেকে ঐতিহাসিক অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে বিভিন্ন মোগল সম্রাটের নামের সঙ্গে মসজিদটির নাম-নির্মাতা হিসেবে যুক্ত করতে চাইলেও সঠিকভাবে তথ্য-উপাত্ত বা দলিল পেশ করতে পারেননি কেউই। তবে অনুমাননির্ভর এসব তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, এটি বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের সমসাময়িককালে নির্মাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সব থেকে নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় ভূষণা রাজ্যের ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা কবি সমর চক্রবর্তীকে। ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তিনি এটি নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের আমলেই নির্মিত স্থাপনা বলে মত দিয়েছেন। ঐতিহাসিক সাতৈর নগরী এখন একটা অবহেলিত জনপদ। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে ভূষণা রাজ্যের সুপ্রাচীন নৌবন্দর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল সাতৈর ও তার আশপাশের অঞ্চল।

সাতৈর শাহী মসজিদের পাশ ঘেঁষেই গেছে ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড বা শেরশাহ সড়ক। কেউ কেউ মনে করেন, সাতৈর শাহী মসজিদ শের শাহের আমলের কীর্তি। ধারণা করা হয় যে, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তার জনৈক পীরের সম্মানে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক সাতৈর মসজিদ থেকে দু-তিনশ হাত দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি ভিটা রয়েছে, যা বর্তমানে ‘মৌলভী বাড়ির ভিটা’ নামে পরিচিত। এ ভিটাটি প্রাচীনকালের ছোট ছোট ইট দ্বারা ভরপুর। এখানে কমপক্ষে আটজন সুফী-সাধকের কবর রয়েছে বলে জানা যায়। লাল মাটি আর ছোট ছোট ইট প্রমাণ করে একসময় কবরগুলো বিরাট স্মৃতিসৌধ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। মসজিদটির মিনারের গঠনশৈলী ও ইটের আকার দেখে বিশেষজ্ঞমহল এটিকে চতুর্দশ আমলের ইমারত হিসেবে শনাক্ত করেছেন।

তবে ঐতিহাসিক মতবিরোধ যা-ই হোক; মসজিদটি আশপাশে কবরে শায়িত ইসলাম ধর্মপ্রচারক আউলিয়াদের ‘সম্মানের প্রতীক’ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল এ বিষয়ে সবাই একমত।আজও সাতৈর শাহী মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় যেসব ধর্ম প্রচারকের কবর বিদ্যমান তারা হলেন-

১. হযরত জালাল শাহ বাগদাদী (রহ.)। মসজিদের পূর্ব পাশের মৌলভী বাড়ির ভিটায় বিদ্যমান।
২. হযরত জায়েদ শাহ বাগদাদী (রহ.)
৩. হযরত বোখারী শাহ বাগদাদী (রহ.)
৪. হযরত সুফী বুট্টি শাহ্ বাগদাদী (রহ.)
৫. হযরত শাহ মইজউদ্দিন তেগ বোরহানি ইয়েমানি (রহ.)
৬. হযরত শাহ সুফী মুছি হাক্কানী (রহ.)
৭. হযরত শায়েখ শাহ আলী ছতরী (রহ.)

হযরত শায়েখ শাহ আলী ছতরী (রহ.) চতুর্দশ শতকে এদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেছিলেন বলে অনুমিত হয়। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। হযরত শায়েখ শাহ আলী ছতরীর (রহ.) কামালিয়্যাত ও ত্যাগী জীবনযাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তার কাছে মুরিদ হয়েছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক দলিল পেশ করেছেন।
৮. হযরত শাহ কলিমুল্লাহ্ (রহ.)
মসজিদের দক্ষিণ পাশে প্রচীনকালের ছোট ছোট ইটে বাঁধানো দুটো কবর রয়েছে। একটি হযরত শাহ কলিমুল্লাহ (রহ.)-এর কবর, অপরটি হযরত মইজউদ্দিন কানী শাহ (রহ.)-এর। মসজিদের পূর্বপাশে রয়েছে হযরত শাহ কলিমুল্লাহ (রহ.) সহোদর হযরত লাল শাহ (রহ.)-এর কবর।
৯. হযরত আবদুল্লাহিল কাফী (রহ.) ও হযরত আবদুল্লাহিল সাফী (রহ.)

সহোদর দুই ভাইয়ের মাজার সাতৈরের কাছে ধোপাডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬ খ্রি.-১৬০৫ খ্রি.) শায়খ আবদুল্লাহিল কাফী (রহ.) ও তার ভাই ইসলাম প্রচারের জন্য এ এলাকায় আগমন করেন। তারা উভয়ে অত্র এলাকায় ইসলাম বিস্তারে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় বহু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
১০. হযরত লাল শাহ (রহ.) ঐতিহাসিক সাতৈর শাহী মসজিদের পূর্ব পার্শে শায়িত রয়েছেন।
১১. হযরত মইজউদ্দিন কানী শাহ (রহ.)
মসজিদ সংলগ্ন দুটি বাঁধানো কবরের একটিতে এই ধর্ম প্রচারক শায়িত রয়েছেন।
১২.হযরত উড়িয়ান শাহ (রহ.)
হযরত উড়িয়ান শাহ (রহ.)-এর কবর দুধ পুকুরের উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। হযরত উড়িয়ান শাহ (রহ.) দ্বাদশ শতকে বাংলায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমন করেছিলেন। তখনকার ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু-বৌদ্ধ অধ্যুষিত, বিরূপ ভাবাপন্ন এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি প্রচ- বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাকে অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে জিহাদের মাধ্যমে তৌহিদের ইসলাম প্রচার করতে হয়েছিল। আঞ্চলিক লোকগাঁথা থেকে জানা যায়, তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ধর্মযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। তার মস্তকের কবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আর তার শরীরের বাকি অংশের কবর সাতৈরে বিদ্যমান।
জনশ্রুতি রয়েছে, শত্রুবাহিনী তার শিরচ্ছেদ করলে মস্তকহীন দেহ নিয়ে তার ঘোড়া ছুটে আসে সাতৈর। এসময় প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসে।

এসময় মস্তকহীন দেহ থেকে আওয়াজ আসে-‘আসরের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি অজুর পানি দাও।’ খাদেম অজুর পানি না দিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘হুজুর, আপনার মাথা কোথায়?’ এই প্রশ্নে সঙ্গে সঙ্গে তিনি উহ! শব্দ করে ওঠেন। শব্দ করলে ঘোড়া ও খাদেমের শিরচ্ছেদ ঘটে। তবে অনেকের ধারণা, শত্রুবাহিনীর কেউ ঘোড়া অনুসরণ করে সাতৈর পৌঁছে খাদেম ও ঘোড়ার শিরচ্ছেদ করে পালিয়ে যান। তবে ঘটনা যা-ই হোক; হযরত উড়িয়ান শাহ (রহ.)-এর দেহ মোবারকের কবরের পাশে তার জনৈক খাদেম ও ঘোড়ার কবর প্রায় আট-নয়শ বছরের ব্যবধানের পরও আজো অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান। আজও ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে হযরত উড়িয়ান শাহ (রহ)-এর দরগাহবাড়ী নামে পরিচিত কবরস্থানে শতশত পুণ্যার্থী ভক্তের সমাবেশ দেখা যায়। বর্গাকার এই মসজিদটি বাইরের দিক থেকে ১৭.৮ মিটার এবং ভেতরের দিক থেকে ১৩.৮ মিটার।

কথিত আছে, ভূমি থেকে মসজিদটির মেঝে প্রায় ০.৭৬ মিটার উঁচু ছিল, বর্তমানে এটি ০.৬ মিটার উঁচু। মোট ৯টি কন্দ আকৃতির গম্বুজ রয়েছে। মসজিদটির ভেতরে পাথরের তৈরি চারটি স্তম্ভ, দেয়ালে এবং দেয়ালের গা সংলগ্ন মোট ১২টি পিলার রয়েছে।
গম্বুজগুলো পেন্ডেন্টিভ পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে। আরব দেশীয় মসজিদগুলোর মতো মোট তিনটি মেহরাব আছে, যার কেন্দ্রটি তুলনামূলকভাবে বড়। মসজিদটি সম্পর্কে অনেক কাহিনী এলাকায় প্রচলিত আছে। যা বিশ্বাস করেই প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু লোক নানা ধরনের মানত নিয়ে আসে। যেমন-
১. মসজিদটি আল্লাহর হুকুমে এক রাতে মাটি ফেড়ে গজিয়ে ওঠে।
২. মসজিদের ভিতরের খুঁটি চারটি বিভিন্ন সময়ে হাসি-কান্না করে।
৩. মসজিদের পিলারগুলোর কাছে যা আশা করা যায় তাই পাওয়া যায়।
৪. মসজিদের ইট বাড়িতে রাখলে উঁইপোকা লাগে না।
৫. মসজিদের ধুলা গায়ে মাখলে যে কোনো ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
৬. মসজিদে এসে মানত করলে নিঃসন্তানদের সন্তান হয়
তবে, আলেমরা এগুলোকে কুসংস্কার, মিথ্যা, বানোয়াট কাহিনী ও ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী বলে চিহ্নিত করেছেন। বছর ত্রিশেক আগে এখানে চৈত্র মাসের শুরুতে মেলা বসতো। শিরকের ছড়াছড়ি দেখে স্থানীয় আলেমরা মেলাটি বন্ধ করে দিয়েছেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সংস্করণের নামে মসজিদটির ঐতিহাসিক কাঠামো বিনষ্ট করা হয়েছে। আইনের তোয়াক্কা না করে টাইলস আচ্ছাদিত করা হয়েছে মসজিদটি। যে কারণে মসজিদটি হারিয়েছে তার প্রকৃত চেহারা। এমনকি সংস্করণের নামে বর্ধিত অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে এ ঐতিহাসিক মসজিদটি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা অভিযোগ ও ক্ষোভ রয়েছে। সাতৈর বাজার বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমান জানান, মসজিদের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে প্রায় ৬০-৭০টি দোকানঘর রয়েছে। দোকানগুলো মাসিক হিসেবে দুই হাজার টাকায় ভাড়া দেয়া। মসজিদের জায়গায় হাট বসে। এ হাট থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় হয়। এছাড়া প্রতি সপ্তাহে শুক্রবারে গরু, ছাগল, মুরগিসহ নগদ মিলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু এ অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিটির লোকের বাইরে কেউ কোনোদিন জানতেও পারে না। চলতি মাসে মসজিদের উন্নয়নের কথা বলে প্রায় শত বছরের একটা গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বোয়ালমারীর সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমীর চারু বাবলু বলেন, সাতৈর শাহি মসজিদটি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ বঙ্গের ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম।

তিনি মসজিদটির পুরোনো ঐতিহ্য ঠিক রেখে, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নের জন্য পরিচালনা কমিটি ও সরকারের কাছে দাবি জানান। ঐতিহাসিক এ মসজিদটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি (পদাধিকার অনুযায়ী) বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঝোটন চন্দ্র বলেন, ‘মসজিদটি জেলার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। গতবছরে মসজিদের মার্কেটে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে বেশকিছু দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেগুলো স্থায়ীভাবে পাকাপোক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, মুসল্লিদের জন্য একটি টিনের শেট নির্মাণ, একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন এবং পুরোনো ঐতিহ্য ঠিক রেখে আলাদা একটি বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও করোনার কারণে কাজের ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট রয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন :