সিয়াম হচ্ছে সকল প্রকার পাপাচার থেকে বিরত থাকা ও নিজেকে পরিশুদ্ধ করা

হাফিজুর রহমানঃ

রহমত,বরকত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে প্রতিবছরের ন্যায় ফিরে এলো পবিত্র রমজান মাস। আরবি মাসসমূহের নবম মাস হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রোজা হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। রোজা শব্দটি ফারসি। এর আরবি পরিভাষা হচ্ছে সওম, বহুবচনে বলা হয় সিয়াম। সওম অর্থ বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা। পরিভাষায় সওম হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে পানাহার থেকে বিরত থাকা। রোজা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে।

এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো, পরহেজগার হতে পারো। এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য, গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জান্নাতের উপযোগী হওয়া, নিজেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। গুনাহের থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তা মানবজাতিকে রমজানুল মোবারব অর্থাৎ বরকতময় মাস হিসেবে পবিত্র রমজান মাসটি নির্ধারণ করেছেন। যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখবে তার প্রতিদান/উপহারস¦রুপ আল্লাহ নিজ হাতে দিবেন বলে কোরআন ও হাদীসের আলোকে বর্ণিত।

রমজান মাসের রোজা পালনকে ফরজ আখ্যায়িত করে আল্লাহ্ তাআলা সুরা বাকারা ১৮৫ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন, রমজান মাস যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে আর এ কোরআন মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, হক বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে সে এতে রোজা রাখবে। রোজা রাখা সম্পর্কে বলা হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ-স্ববল সকল মুসলমান নর-নারীর জন্য রোজা রাখা ফরজ বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যাতে পরিশুদ্ধতা, খোদাভীতি অর্জন, ত্যাগ ও কৃচ্ছ্র সাধনের মাস এই মাহে রমজান। মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নাজিল হয়েছে এ মাসেই।

রমজানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ তা’আলা এ মাসটিকে স্বীয় ওহি সহিফা ও আসমানি কিতাব নাজিল করার জন্য মনোনীত করেছেন। অধিকাংশ কিতাব এ মাসেই নাজিল হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সহিফা রমজানের ১ তারিখে, তাওরাত রমজানের ৬ তারিখে, জাবুর রমজানের ১২ তারিখে, ইঞ্জিল রমজানের ১৮ তারিখে এবং পবিত্র কোরআন রমজানের শেষদিকে কদরের রাত্রিতে নাজিল হয়েছে। তাই সবদিক থেকে মুসলমানদের কাছে মাসটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। রোজা মানুষকে আত্মশুদ্ধি, পবিত্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। সৎ, সুন্দর ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবনযাপনের জন্য রোজার মাস হচ্ছে অনুশীলনের।

এ মাসে মুসলমানগণ তাদের দেহ ও আত্মা পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পান। তাই এ মাসের শিক্ষা বছরের বাকি সময়ে কাজে লাগাতে হবে। দীর্ঘ এক মাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, ভোগবিলাস, অন্যায় ও অসৎ কর্ম হতে বিরত থেকে মুমিনগণ রোজা পালন করে আত্মশুদ্ধি ও কৃচ্ছ্র সাধনে ব্রতী হন। কেবল পানাহার ও ভোগবিলাস থেকেই বিরত থাকা সিয়ামের শর্ত নয়, প্রকৃত সিয়াম সাধনা হচ্ছে সকল প্রকার পাপাচার, অন্যায়-অপকর্ম থেকে বিরত থাকা।

এ শিক্ষা শুধু রোজার মাসের জন্যই নয়, বছরব্যাপী রোজার শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে। সিয়ামের মাধ্যমে আত্মিক ও নৈতিক উন্নতি ঘটে। লোভ-লালসা, হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে রোজার মূল চেতনায় উজ্জীবিত হতে হবে। রোজা সংযমের বার্তা নিয়ে এলেও কিছু অসৎ ব্যবসায়ী এ সময় হয়ে ওঠে অসংযমী, বেপরোয়া। অনেক ক্ষেত্রে কোন কারণ ছাড়াই তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় কোন কোন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তারা যেন এই মাসের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকে। এটা রমজানের পবিত্রতা ও শিক্ষার পরিপন্থী। তাই সকল বিভাজন ভুলে সঙ্গত কারণেই আশা করা যায় যে, গ্রীষ্মের গরম থাকা সত্তেও রমজান হবে সহনশীল, ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক।

আপনার মতামত লিখুন :