হারুন-অর-রশিদ বাবু, রংপুর
রংপুরের পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হক সুমনের বিরুদ্ধে ত্রি-ফসলি কৃষি জমিতে মুজিব বর্ষের আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাসস্থান নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করে। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরেও আওয়ামীলীগের নিয়োগপ্রাপ্ত পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হক সুমন সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে অনিয়ম চালিয়ে যান। এতে তাকে সহযোগিতা করেন অন্নদানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান সংগ্রাম। তার মাধ্যমে সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নাগরিক সুবিধা ছাড়াই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে শল্লারবিলে দায়সারাভাবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩২০ টি ঘর নির্মাণ করা হয়। পুনর্বাসিতদের জন্য নাগরিক সেবা কমিউনিটি সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ/মন্দির ও কবরস্থান, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মক্তব, খেলার মাঠ ও অভ্যন্তরীণ রাস্তাসহ কিছুই নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাল ভোট, দিনের ভোট রাতে দেখানো ও ডামি নির্বাচনের কারিগরদের মধ্যে অন্যতম নাজমুল হক সুমন। ৫ আগস্টের পরে তিনি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পরেও টানা ১০ মাস পীরগাছায় কর্মরত আছেন।
প্রায় ২০ কোটি টাকার প্রকল্প তৎকালিন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ি দরপত্র ছাড়াই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় ৪৩০টি ঘর নির্মাণের বরাদ্দ আসে পীরগাছায়। প্রতি ঘর তৈরিতে বরাদ্দ হয় তিন লাখ চার হাজার টাকা। প্রথম অবস্থায় ১১০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বাকি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৩২০টি ঘর নির্মাণ শুরু হয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পটির বরাদ্দের পরিমাণ অনুযায়ী ৫ থেকে ৬ ফুট উঁচু করে মাটি ভরাটের পরিবর্তে দেড় থেকে তিন ফুট উঁচু করা হয়েছে। যা বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা। ৩২০ টি ঘর নির্মাণকাজ শুরুর আগে সেখানে ৫-৬ ফুট উঁচু করে মাটি ভরাটের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কাবিখা প্রকল্পের মাধ্যমে ৫৬৬ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাবিখা প্রকল্পে শ্রমিক দিয়ে মাটি ভরাটের নিয়ম থাকলেও করা হয়েছে অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনোভাবেই ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। এর পরেও তারা আশ্রয়ণ প্রকল্পকে ঝুঁকিতে ফেলে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন ইউএনওসহ সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া প্রকল্পস্থলে ড্রেজার মেশিন দিয়ে গভীর খনন করে প্রায় চার কোটি টাকার মাটি বাইরে বিক্রি করেন ইউএনই নাজমুল হক সুমন। এতে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতিমধ্যে ভাঙন কাছাকাছি চলে এসেছে।
পীরগাছা উপজেলায় ওই আশ্রয়ন প্রকল্পের ৩২০ বাড়ি নির্মাণের পূর্বেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু থেমে থাকেনি তাদের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হক সুমন। তিনি উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক হাফিজার রহমান সংগ্রামকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়ে শল্লারবিলে ৩১৫ ও অন্নদানগর কলেজ সংলগ্ন পাঁচটি ঘর নির্মাণ করেন। শল্লারবিলের আশ্রয়ন প্রকল্পে সর্বমোট ৪২৫ টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে নেই কোন নাগরিক সুবিধা।
এরই মধ্যে তাসনিম ও কহিনুর বেগমসহ চারজন মৃত্যুবরণ করেছেন। যাদেরকে প্রকল্প সীমানার বাইরে দাফন করা হয়েছে। অনেকের কবুলিয়ত সম্পাদন হয়নি, ভিজিএফ প্রদান করার কথা থাকলেও দেওয়া হয়না।
নিয়ম অনুযায়ী ৪০০ বর্গফুট আয়তনের ২ কক্ষ বিশিষ্ট সেমিপাকা একক ঘর নেই। প্রকল্পটিতে করা হয়েছে বহুমুখী অনিয়মেরর মাধ্যমে। পানীয়জলের সমস্যায় ভুগছে আশ্রিতরা। ১০টি পরিবার মিলে একটি নলকূপের পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এছাড়া ঘর বরাদ্দে সুবিধাভোগীদের কাছে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে ইউএনও’র বিশেষ টোকেন ব্যবহার করা হয়েছে। এখান থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ইউএনও। স্থানীয় বাসিন্দা খন্দকার মাহবুবার রহমান টিটুল অভিযোগ করে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষেই ড্রেজার মেশিন বসিয়ে পাইপের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে সামান্য ব্যবহার করে সমস্ত বিক্রি করা হয়েছে।
পীরগাছার তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, প্রকল্পটি ইউএনও নাজমুল হক সুমনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবেন।
প্রকল্পে অনিয়ম দূর্ণীতির কথা স্বীকার করে পীরগাছা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, আমি নতুন এসেছি এই প্রকল্পের বিষয় ইউএনও স্যার বলতে পারবে।
পীরগাছার ইউএনও নাজমুল হক সুমন আশ্রয়ণ প্রকল্পে ড্রেজার মেশিন ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ড্রেজার দিয়ে শুধু মাত্র ফিনিশিং করা হয়েছে। নাগরিক সুবিধার বিষয়ে বলেন, বরাদ্দ সাপেক্ষে করা হবে। দুর্নীতির প্রসঙ্গটি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান।
ড্রেজার মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, এক হাজার সিফটি বালু ৩ হাজার একশত টাকায় কেটেছি। তিনি বলেন, সরকারি কাজে ড্রেজার ব্যবহারে কোনো বাধা নেই।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকল্প জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের পর বাস্তবায়ন নিয়ে কোন মন্তব্য করেনি। মসজিদ-মন্দির, কবরস্থান ও বন্যায় ডুবে যাওয়ার বিষয়ে বলেন, প্রকৌশলী দিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জবাব না দিয়ে বলেন, আমি ব্যস্ত আছি পরে কথা হবে।