ওস্তাদ বায়ে প্লাষ্টিক!

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

মো.ইউসুফ আলী-

ওস্তাদ বায়ে প্লাষ্টিক! এ কথাটি আমরা সাধারণত সড়ক পথে শুনতে পাই। যা কিনা সড়কে চলাচলরত কোন গাড়ীর হেলপার তার ড্রাইভারকে বলে থাকেন। তিনি হয়ত এ উদ্দেশ্যেই একথা বলে থাকেন যে,তার বামপাশ দিয়ে চলাচলরত প্রযুক্তির বহুল আবিস্কৃত গাড়ীটি হয়তবা প্লাষ্টিক বডির। বা প্লাষ্টিকের মত হালকা কোন যান। আসলে আমরা আজ এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে আমাদের চারপাশে তাকালেই প্লাস্টিক ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার ব্রাশ থেকে শুরু করে, টিফিন বক্স, পানির বোতল, দুয়ারের পাপস, বসার আসবাব মোড়া কিংবা চেয়ার টেবিল, বাজারের ব্যাগ, খাবারের মোড়ক এমনকি কাপড়ের ফাইবার, সবখানেই প্লাস্টিক। একসময় মানুষ প্লাষ্টিকের কথা ভুলেও মনে করেনি। কিন্তু এখন, প্লাস্টিক ছাড়া চলাই কঠিন। কারণ, এটা হালকা, টেকসই, পানিতে নষ্ট হয় না, দামও কম। অথচ সেই প্লাস্টিকই আমাদের জন্য অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।
যে প্লাস্টিক ছাড়া আজকের পৃথিবী অচল, সেই কৃত্রিম প্লাস্টিকের ইতিহাস কিন্তু খুব বেশী পুরোনো নয়, প্লাস্টিক প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ১৯০৭ সালে। তখন মানুষ খুব খুশি হয়েছিল। কারণ, এটা দিয়ে অনেক কিছু তৈরি করা যায়। মাটির হাঁড়ি ভেঙে যায়, কাগজ নষ্ট হয়, কিন্তু প্লাাস্টিক থাকে শক্ত আর টেকসই। শুরুতে প্লাস্টিক ব্যবহার সীমিত ছিল। কিন্তু শিল্পকারখানা বাড়তে থাকায়, মানুষের চাহিদা বাড়তে থাকায় প্লাস্টিকও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এখন এমন অবস্থা যে আমাদের খাবার, পোশাক, প্রযুক্তি সব কিছুতেই প্লাস্টিক আছে। প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটা সহজে নষ্ট হয় না। একটি প্লাস্টিক ব্যাগ বা বোতল মাটির নিচে পচতে সময় নেয় শত থেকে হাজার বছর। ফলে শহরের ড্রেন ভর্তি হচ্ছে পলিথিনে, গ্রামে খেলার মাঠে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকে চিপসের প্যাকেট-পলিথিন, সাগরে প্রতিবছর জমছে কোটি কোটি টন প্লাস্টিক । এতেকরে সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ, ডলফিন, পাখি এরা খাবার ভেবে প্লাস্টিক খেয়ে মরে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতিও ধ্বংস হচ্ছে, মানুষের খাবারেও প্লাস্টিক ঢুকছে। আমাদের বহুল ব্যবহৃত এই প্লাষ্টিকের বর্জ্যে আমাদের প্রকৃতি ও চারপাশের পরিবেশ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিষাক্ত আবর্জনায় । বাংলাদেশের নদীগুলো, যেমন বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা সব নদী প্লাস্টিকের চাপে ভুগছে। বর্ষার সময় ড্রেন ভর্তি হয়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি করে। এভাবে যদি প্লাস্টিক ব্যবহার চলতে থাকে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের ওজন বেশি হবে। সাগরে মাছের বদলে পাওয়া যাবে শুধু বোতল ও পলিথিন, জমিতে চাষ করা যাবে না, বাতাসে উড়বে অদৃশ্য কণা। তখন পৃথিবী হবে এক বিশাল আবর্জনার স্তুপ। প্লাষ্টিকের এই বহুল ব্যবহার রোধে ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালিন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সে আইন উপেক্ষিত হয়েছে। যে কারনে বাজারে এখন অতি সহজেই পাওয়া যায় এই পলিথিন ব্যাগ। আমরা জানি,ঢাকা শহরে প্রতিদিন যত আবর্জনা তৈরি হয়, তার বড় একটা অংশই প্লাস্টিক। গ্রামেও এখন প্রতিটি দোকানে প্লাস্টিকের প্যাকেট ব্যবহার হয়। বিভিন্ন গবেষণা সূত্র থেকে জানা যায়,বছরে প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, এর অর্ধেকের বেশি পুন:র্ব্যবহার যোগ্য নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের রক্ত, ফুসফুস এমনকি গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি ক্যানসার, হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট ও হরমোনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের এক গবেষণায় প্লাষ্টিকের আরো ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা বলেছে যে,মানুষ তাদের বাড়িতে বা গাড়িতে প্রতিবার নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় সম্ভবত উল্লে¬খযোগ্য পরিমাণে মাইক্রোপ¬াস্টিক কণা গ্রহণ করে। যা অতি সহজেই ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। প¬স ওয়ান নামের একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এই গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে, মানুষ প্রতিদিন ৬৮ হাজার পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শ্বাসের মাধ্যমে নিতে পারে। এর আগের গবেষণাগুলোতে বায়ুবাহিত মাইক্রোপ-াস্টিকের বৃহৎ টুকরো চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য তেমন হুমকিস্বরূপ নয় বলে বলা হয়েছিল। কারণ এগুলো বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকে না বা ফুসফুসতন্ত্রের গভীরে চলে যায় না। নতুন গবেষণা প্রতিবেদনের লেখকরা জানিয়েছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণাগুলো ১ থেকে ১০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে অথবা মানুষের চুলের পুরুত্বের প্রায় এক-সপ্তমাংশ। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য আরও হুমকিস্বরূপ। কারণ এগুলো সহজেই সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে। ফ্রান্সের তুলুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোপ্ল¬াস্টিক গবেষক এবং গবেষণার সহ-লেখক নাদিয়া ইয়াকোভেনকো বলেছেন, আমরা যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা পেয়েছি তাতে আমরা বেশ অবাক হয়েছি। কারন- এটি পূর্বের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। কণার আকার ছোট এবং টিস্যুতে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য সুপরিচিত, যা বিপজ্জনক। কারণ এটি রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে এবং শ্বাসযন্ত্রের গভীরে যেতে পারে। নতুন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মাইক্রো প্লাস্টিক মানবদেহের প¬াসেন্টাল এবং মস্তিষ্কের বাধা অতিক্রম করতে পারে। এই কণা দেহে প্রবেশের জন্য খাদ্য এবং পানিকে প্রধান এক্সপোজার রুট বলে মনে করা হয়েছে। মাইক্রোপ্ল¬াস্টিক দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের প্রদাহের সাথে যুক্ত, যা ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
তবে এর থেকে বাঁচার সমাধানও খুজছেন বিজ্ঞানীরা। সমাধানের উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এই রমূহুর্তে যা ভাবছেন তা হলো-প্লাস্টিকের সমস্যা দূর করতে হলে একবার ব্যবহার করা হয়, এমন প্লাস্টিক বাদ দিতে হবে। কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প পদ্ধতিগুলোর প্রতি বাড়াতে হবে পৃষ্ঠপোষকতা । বাড়াতে হবে রিসাইক্লিং ।তৈরি করতে হবে জনসচেতনতা । কঠোরভাবে মানতে হবে আইন । বন্ধ করতে হবে প্লাস্টিক পণ্য তৈরির উপকরণ ও যন্ত্র আমদানি । প্লাস্টিক আমাদের জীবনের অংশ বটে, কিন্তু পৃথিবীর ভবিষ্যৎ তার চেয়ে বড়। এখনই সচেতন হলে আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য সবুজ ও সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে পারি। আজই শপথ নিন কম প্লাস্টিক ব্যবহার করব, বিকল্প ব্যবহার করব, পরিবেশ বাঁচাব। কারণ, সবুজ পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ