মো.ইউসুফ আলী
চিকুনগুনিয়া একটি মশাবাহিত রোগ। যা চিকুনগুনিয়া ভাইরাস দ্বারা ছড়ায়। ১৯৫২ সালে আফ্রিকার পূর্ব উপকুলীয় দেশ তানজানিয়ায় এটি প্রথম শনাক্ত হয়। তাইতো চিকুনগুনিয়া শব্দটি এসেছে আফ্রিকার পূর্ব উপকুলীয় দেশ তানজানিয়ার কিমাকোন্ডে ভাষা থেকে। কিমাকোন্ডে ভাষায় “চিকুনগুনিয়া” শব্দের অর্থ হলো “যা বেঁকে যাওয়া” বা “যা কুঁজো হয়ে যাওয়া”, যা এই রোগের কারণে হওয়া জয়েন্টের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ভঙ্গিমাকে নির্দেশ করে। এই রোগে আক্রান্ত হলে জ্বর, জয়েন্টে ব্যথা, মাথাব্যথা, পেশী ব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া এবং ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা যেতে পারে। চিকুনগুনিয়ার কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তবে লক্ষণগুলো উপশমের জন্য বিশ্রাম, প্রচুর পরিমাণে তরল পান করা এবং ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকুনগুনিয়া সাধারণত মারাত্মক হয় না, তবে জয়েন্টে ব্যথা কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।এই রোগটি একজন থেকে অন্যজনে সরাসরি ছড়ায় না, মশার মাধ্যমেই ছড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে, চিকুনগুনিয়া মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিস, তবে এটি বিরল।
জানাযায়, ২০০০সালে অর্থাৎ ২৫ বছর আগে বাংলাদেশে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া ভাইরাসবাহিত এডিস মশা শনাক্ত হয়। এই ২৫ বছরে এডিস মশার কামড়ে মারা গেছে অন্তত কয়েক হাজার মানুষ। আর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত কয়েক লাখ। চিকুনগুনিয়া আগে শহরকেন্দ্রীক একটি সিজনাল প্রাদুর্ভাব হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশাবাহিত এই চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন দেশের প্রায় সব এলাকার জনগণ। এর আগে এই রোগ রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা একযোগে সারা দেশে বিস্তার লাভ করেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে এডিস মশা বৃদ্ধির কারণে চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি, রাজধানীর শহরতলী কেরাণীগঞ্জে মশার উপদ্রব অধিকহারে বেড়েছে। সকাল-সন্ধ্যা ছাড়াও প্রায় সারাদিনই মশার উপদ্রব বেশি। প্রয়োজনীয় প্রটেকশন নেওয়ার পরও মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাসসহ বহুবিধ রোগের বাহক এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে সরকার অবগত হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় তা নিরসন হচ্ছে না বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেরাণীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো.মোকাদ্দেছ আলী জানান,তার নিয়ন্ত্রনাধিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও এ সংক্রান্ত রোগির চাপ আগের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে। তবে তারা সাধ্যমত চিকিৎসা সেব প্রদানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরো বলেন,
যেহেতু চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং এটি এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়, সেহেতু মশার কামড় থেকে নিজেদের রক্ষা করা এখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানাযায়,এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলাগুলোতেও চিকুনগুনিয়া দেখা দিতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখাযায়, ১০ বছর আগের মতো করে ফের ফিরছে চিকুনগুনিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওই প্রতিবেদনে আরো জানিয়েছে, ১১৯টি দেশের প্রায় ৫৬০ কোটি মানুষ এখন বিপদে। তাই মশাবাহিত যে কোনো রোগ থেকেই সতর্ক থাকা খুব জরুরি। সূত্র : রয়টার্স। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, ভারত মহাসাগর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ইউরোপ এবং অন্যান্য মহাদেশে দুই দশক আগে চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ে। মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের মহামারির পুনরাবৃত্তি রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জেনেভায় সাংবাদিকদের ডব্লিউএইচওর মেডিকেল অফিসার ডায়ানা রোজাস আলভারেজ বলেন, ১১৯টি দেশের ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা উচ্চ জ্বর, গিঁটে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। লা রিইউনিয়ন, মায়োট, মরিশাসসহ আক্রান্ত ভারত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে এবারও প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রোজাস আলভারেজ বলেন, লা রিইউনিয়নের জনসংখ্যার আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। ভাইরাসটি এখন মাদাগাস্কার, সোমালিয়া এবং কেনিয়ার মতো দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাসটি। অতএব সাধু সাবধান। এখন বড় প্রশ্ন, মশক ধ্বংসের দায়িত্ব কার? সিটি করপোরেশন, না স্বাস্থ্য বিভাগের? যদি বলি, উভয়েরই, তাহলে কি ভুল বলা হবে? আমার ধারণা ভুলও হতে পারে, তবে আমরা জানি বিশ্বের অনেক দেশে এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করে সরকার । অথচ আমাদের দেশে একদিকে যেমন মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছেন সরকার আবার অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়ও বহন করছে না। তাহলে জনগণ যাবে কোথায়? তবে এ বিষয়ে নাগরিক সচেতনতার যে বিকল্প নেই, সে কথাও আমরা সবাই মানি। সে দায় প্রতিটি নাগরিককে পালন করতে হবে তা-ও ঠিক। আমরা বলি, এ কাজে স্বাস্থ্য বিভাগকেও পূর্ণ উদ্যমে, শক্তিতে ও সরঞ্জামসহ সক্রিয় হতে হবে। এক কথায় জনসেবাদানের দায়িত্ব নিতে হবে। তা না হলে ‘জনস্বাস্থ্য বিভাগ’ এ শব্দযুগলই তো অর্থহীন হয়ে পড়বে।
মশার ওষুধ শুধু সিটি করপোরেশন কিংবা পৌরসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সব এলাকার জন্য সরকারকে এই আয়োজন করতে হবে। সুতরাং ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের প্রতিটি জায়গায় মশক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার বিষয়টি হালকাভাবে দেখলে চলবে না। এটি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে এভাবে চলতেই থাকবে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে এমনটি হতে পারে না। এখানে নজরদারি ও সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। আমরা সেটাই আশা করি।
সুতরাং আমরা এ সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ করবো, জনজীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে আপনারা আন্তরিক হোন। দেশবাসীকে এডিস মশার যন্ত্রণা থেকে বাঁচান। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিও অনুরোধ করবো যে, এ সংক্রান্ত সকল কর্মকান্ডের যথাযথ তদারকি করুন। কারন জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এলেইতো প্রাণ ফিরে পাবে বাংলাদেশ ।