বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

সাবেরা সরমিন হক

হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রে হীরক রাজার একটি বিখ্যাত উক্তি হলো: “আজ থেকে বন্ধ পাঠশালা। এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।” এই উক্তিটি দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, যারা বেশি লেখাপড়া করে, তারা রাজার (“হীরক রাজা”) অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে, তাই তিনি শিক্ষা বন্ধ করতে চান।

এই উক্তিটি আজও প্রাসঙ্গিক বলে আমার মনে হয কারণ  স্বৈরাচারী শাসনের চিত্র পরিস্কার। হীরক রাজা  শিক্ষা এবং জ্ঞানকে ভয়ংকর হিসেবে দেখেছেন।হীরক রাজা তার রাজ্যে শিক্ষা চায় না। মাইনে করা কবিকে দিয়ে নিজের মনের মতো মগজ ধোলাই করার বিভিন্ন ছড়া শিখিয়েছে আজীবন।

বাংলাদেশে বহুদিন থেকে  ‘গণতন্ত্র  চর্চার পাঠশালা বন্ধ’, বহুদলীয় রাজনীতির চর্চাও বন্ধের পথে।  দীর্ঘদিন বিএনপি রাজপথে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রাম করছে। দলীয় প্রধান বেগম খালেদাজিয়া সহ নেতাকর্মীরা জেল খেটেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন,ঘড়বাড়ি ছাড়া হয়েছেন। তারেক জিয়াকে নির্বাসিত করা হয়েছেন কারন তার চাওয়া ছিল ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশ একটি জাতীয় দৈনিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন,

‌’অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে আদৌ নির্বাচন করা সম্ভব কি না, কোনো কোনো মহল থেকে এমন প্রশ্ন উত্থাপনের বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কেউ সময়ক্ষেপণ করতে চাইছে কি না, এ ব্যাপারে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে’।

হাসিনা সরকার পতনের পর বিএনপি’র পক্ষে ইউনুস সরকারকে অবাধ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি নানা কৌশলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে দেশকে অন্ধকারে দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার মনে কী তারা বাংলাদেশে আপাততো  নির্বাচন চান না? জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা কবরে সেটা রাষ্ট্রের সকল নাগরিক চায়, জনগণের সেই চাওয়ার প্রতিফলন ঘটাতে আলোর দিকে আসতে হবে।

তারেক জিয়া অন্ধকারের নির্বাচন চান না, তার চাওয়া গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণমানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। কেমন না তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের গণমানুষের কাছে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সমাদৃত।

জিয়াউর রহমানের জীবনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দেশের সংকটে তিনি বারবার বহুমাত্রিক প্রতিভা নিয়ে গণমানুষের সহায়ক হিসাবে কাজ করেছেন। তারপক্ষেই সম্ভব হয়েছে   বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করা। তাই তিনি নির্দধায় বলতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ভাষা যদি একটি ফুল হয়, ধর্ম আরেকটি ফুল। ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ফুল নিয়ে যে তোড়া বেঁধেছি- সেটিই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’।  যদি কোন অপশক্তি জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের গতিপথ রুদ্ধ করে  নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে  অগণতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায় তাদের পরিণতি যে অকরুণ অপ্রত্যাশিত হবে তাতে কোন সন্ধেহ নেই। কারন  পৃথিবীর ইতিহাসে কোন অপশক্তি স্থায়ী হতে দেখা যায়নি।

২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে যেকোনো একটি দিনে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এই ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তার এই ঘোষণার পর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে কতটা প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন? সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও স্বংসয় প্রকাশ করছেন নির্বাচন নিয়ে। তার মানে কী দাঁড়ালো? তার ইচ্ছা মতো সময়ে  যেন তেন  নির্বাচন  করে  তার পছন্দের  দলকে রাষ্ট্রীও ক্ষমতাতে বসানো?

দেশে অস্থায়ী সরকার আসে নিরেপেক্ষ গ্রহণ যোগ্য নির্বাচন দিয়ে জনগণের ভোটে  নির্বাচিত দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে।

কিন্তু বর্তমান সরকার বহুমাত্রিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করেছে যা স্বল্প সময়ে সস্পর্ণ করা মোটেও সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে আমি আফ্রিকান একটা অবিনাসী  গানের  দু’টো লাইন স্মরণ করাতে চাই, ‘মুহোগো ওয়া জাঙ্গো’ম্বে’-এর প্রতিটি স্তবক শিক্ষানীয় এবং রাজনৈতিক দর্শন তো বটেই।

‘কেন্ডা ম্বেলে না নিউমা”,বাংলা যদি বলি তাহলে , ‘জীবনে যদি আমরা অতিরিক্ত ব্যস্ত হই, সবকিছু একসঙ্গে ধরতে চাই, তাহলে কোনো কিছুই আমরা সঠিকভাবে করতে পারি না। যে ব্যক্তি সর্বদা ছুটে চলে, সে কখনোই তার পথ খুঁজে পায় না’। অতএব রাজনৈতীক মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শীতা কাজে লাগিয়ে আমাদের গণতন্ত্রের পূর্ণঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। যাহোক ওয়াশিংটন চাইছে  বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে। সুবৃহৎ গণতান্ত্রিক  সংগঠন হিসাবে  বিএনপি আশাবাদী  বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ওয়াশিংটন তাদের সহযোগিতা করবে করন  বিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না, দারকার সুসংগঠিত সংগঠন।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আহ্বানে ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত   গণতন্ত্র সম্মেলন ‘সামিট ফর ডেমোক্র্যাসি’র অংশগ্রহণকারীদের আনুষ্ঠানিক তালিকায়  বাংলাদেশের নাম ছিলনা।

বৈশ্বিক ব্যবসায়িক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স’ ইউনিটের ২০২০ সালের গণতন্ত্র সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা মিশ্র শাসনের দেশের তালিকায় রয়েছে।

সাধারণত সেইসব দেশকে হাইব্রিড রেজিম বলে বর্ণনা করা হয় যেসব দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা রয়েছে, কিন্তু সেখানে নিয়মিত নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক দমন পীড়নও চলে। অর্থাৎ এসব দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা এমন শাসন ব্যাবস্থার জন্য কী মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম?  বলতে দ্বিধা নেই যে, ইউনুস সরকার বাংলাদেশ এখন কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা চলচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসন চালানোর পথ পরিস্কার করছে।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে আঘাত করেছে, কিন্তু রাজনৈতীক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়না। বরং একদলীয় বা একক শাষন ব্যাবস্থা  পথে হাটছে দেশ। এতদিন  বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারতো।  দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সব দলের অংশগ্রহন মূলক নির্বাচন না হলে, তা শূন্যতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এবং সবকিছু বুমেরাং হলে বলার কিছু থাকবেনা।

লেখক – শিল্প ব্যাবসায়ী, সাংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ