মোঃ আসাদুজ্জামান, বরগুনা:
আজ ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে আঘাত হেনেছিল ট্রপিক্যাল সাইক্লোন সিডর। এর ধ্বংসলীলায় মুহূর্তেই পাল্টে যায় উপকূলীয় জনপদের জীবন। তীব্র ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ¡াস পুরো উপকূল বিশেষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল উপকূলের জেলাগুলো লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, পশুপাখি আর অসংখ্য মানুষ। আজ সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের ১৮ বছর পূর্তি। আজও সেই দুঃসহ দিনের কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন বরগুনাসহ সমগ্র উপকূলবাসী। এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সেই ভয়াল সিডরের ভয়। যাদের সিডর প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা আছে তাদের অনেকেই সাগরে লঘুচাপ হলেই ভীত হয়ে ওঠেন।
বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, ঘুর্নিঝড় সিডরের আঘাতে বরগুনা জেলায় ১ হাজার ৩৪৫ জন মারা যান, নিখোঁজ হয়েছেন ১৫৬ জন। ঝড়ের কবলে মারা পড়ে ৩০ হাজার ৪৯৯টি গবাদি পশু ও ৬ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯টি হাঁস-মুরগি। জেলার ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬১টি পরিবারের সবাই কমবেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে ৭৭ হাজার ৭৫৪টি পরিবার।
বরগুনায় সিডরের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সদর উপজেলার নলটোনা গ্রাম। এই গ্রামে সিডরের এক বছর আগে থেকেই ছিল না কোনো বেড়িবাঁধ। সিডরের সময় এ জায়গায় জলোচ্ছ¡াসের উচ্চতা ছিল ২০ ফুট। ঝড় থেমে গেলে সেখানে অর্ধশতাধিক মানুষের লাশ পাওয়া যায়। তখনও এলাকাটি পানির নিচে তলিয়ে ছিল। লাশ দাফনের জন্য কোনো জায়গাও পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে লাশগুলো নিয়ে আসা হয় বরগুনা-নিশানবাড়িয়া সড়কের পাশে পশ্চিম গর্জনবুনিয়া গ্রামে। দাফনের কাপড় ছাড়াই ২৯ জনকে ১৯টি কবরে দাফন করা হয়। পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে চারটি কবরে তিনজন করে ১২ জন, তিনটি কবরে দুজন করে ৬ জন ও ১২টি কবরে একজন করে ১২ জনের লাশ দাফন করা হয়। কবরগুলোকে একটু উঁচু করে রাখা হয়।
সিডরের ধংসলীলার ১৮ বছরেও বরগুনায় নদী ও সাগর তীরবর্তী এলাকায় নির্মান করা হয়নি টেকসই বেরিবাঁধ। ফলে ঝড়ের সংকেত পেলেই উপকূলবাসী মৃত্যু আতংকে দিন কাটায়। সিডর-পরবর্তী সময়ে উঁচু টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি উঠলেও সেই দাবি পূরণ হয়নি আজও। প্রতিনিয়ত ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে ঢুকছে জোয়ারের পানি, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, ভেসে যাচ্ছে মাছের ঘের।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনার ২২টি পোল্ডারের আওতায় প্রায় ৮০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটারই নিম্ন উচ্চতার, যা প্রতি বছরই বড় ধরনের ঝুঁকিতে থাকে। স¤প্রতি ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বরগুনা জেলার ১৩ কিলোমিটার বাঁধের তীর সংরক্ষণ, ৯ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ এবং ৫১ কিলোমিটার মেরামতের কাজ শেষ হয়েছে। আরও ৫০ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান।
বরগুনা সদর উপজেলার নিশানবাড়ীয়া গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আসলাম খান জানান, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন স্ত্রী ও সন্তানকে। সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম