সিনথিয়া আক্তারঃ
শুধু সিলেট বিভাগের বাগান থেকে উৎপাদিত চা রপ্তানীসহ স্থানীয়ভাবে গড়ে প্রতিবছর বিক্রি হয় ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকার। এ থেকে বিপুল পরিমান রাজস্ব আয় করছে সরকার। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জের চা বাগানগুলিতে দৈনিক ১৭০টাকা হাজিরায় কাজ করছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিক। ব্রিটিশ আমল থেকে চা বাগানে নিয়োজিত শ্রমিকরা কাজে শক্তিযোগানের জন্য বাগানের মধ্যে থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণাধীন শ্রী মঙ্গল পণ্যাগার থেকে কেরু এণ্ড কোম্পানীর দেশীয় বাংলা মদ পাট্টাতে গিয়ে ২০/৩০ কিংবা ৫০ টাকার বিনিময়ে পান করতেন। এসব এলাকায় রয়েছে ৮০-৯০টি লাইসেন্সকৃত দোকান। হঠাৎ করেই বাংলা মদ প্লাষ্টিক বোতলে হওয়ায় এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চা শ্রমিকরা। ১৩টি পণ্যাগারের মধ্যে শ্রীমঙ্গলে সব থেকে বেশি পরিমান বাংলা মদ বিক্রি হয়। কিন্তু বেশি মূল্যের কারনে গত ২ মাস ধরে লাইসেন্সীরা বাংলা মদ ইস্যু নেয়া বন্ধ রেখেছে। এতে লাইসেন্সধারীদের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে কেরু কোম্পানীও লোকসানের দিকে যাচ্ছে। ‘পলিথিন প্লাষ্টিক পেইড বোতল বর্জন পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন গত ১২ জুলাইবাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন। সেখানে এসব তথ্য উল্লেখ করে সিলেট বিভাগের চা শিল্প রক্ষায় কেরুর উৎপাদিত দেশীয় মদ প্লাষ্টিক পেইড বোতলের পরিবর্তে প্রচলিত ড্রামে সরবরাহের অনুরোধ করেন।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত মদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিমিটেড। প্রতিষ্টানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাব্বিক হাসান। প্রতিষ্টানটিতে চার জনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি সিণ্ডিকেড । এদের অনেকেই সরকারি নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে একইস্থানে তিন বছরের বেশি কর্মরত রয়েছেন।
সিলেট বিভাগের ৮৪ জন দেশী মদ লাইসেন্সী গত ৫ জুলাই চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কাছে এক আবেদনে দেশীয় মদ প্লাষ্টিক বোতলে সরবরাহ না করে ড্রামে সরবরাহের আবেদন করেন। তারা বলেন, সিঙ্গেল ইউজড প্লাষ্টিক পেইড বোতল ইতিমধ্যে সরকার নিষিদ্ধ করেছে। গত ২৫ জুন পরিবেশ দিবসে প্রধান উপদেষ্টাও প্লাষ্টিক বোতল নিষিদ্ধ করেন। লাইসেন্সধারী বাংলা মদ বিক্রেতারা এ ব্যাপারে প্লািিষ্টকের বোতল বাতিল চেয়ে চলতি মাসের শুরুতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনও করেন।
এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী সাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, কেরু এণ্ড কোং পেইড বোতল ওটিএমএর মাধ্যমে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্টান হতে ক্রয় করে। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্টানের এ বিষয়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেও কেরু এণ্ড কোম্পানীর ডিস্ট্রিলারী প্রতিষ্টানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব বিবেচনায় পরিবেশ বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় প্লাষ্টিক বোতল বন্ধ করার নীতিগত সীদ্বান্ত নিয়েছে। কেরু এণ্ড কোং পেইড বোতলে দেশীয় বাংলা মদ বিক্রির অনুমোদন বাতিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হলো।
সংশ্লিস্টদের মতে, কেরুর বাংলা মদ (সিএস) প্লাস্টিকে বোতলজাত করনের কারনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পরবে ফরেন লিকার (এফএল)। অথচ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের এ প্রতিষ্ঠান কেরু থেকে সরকার রাজস্ব পায় অনেক বেশি। এর নব্বই শতাংশই আসে এফএল থেকে। গত অর্থবছর যেখানে এফ এল বিক্রয় ছিলো ২,২৮,৭৯৩ কেস। সেখানে এই অর্থবছর সেল হয়েছে ২,০২,৬৯৮ কেস। এতে এই অর্থবছরে সরকার আয় বঞ্চিত হয় প্রায় ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার টাকা। কেরুর এমডির একগুঁয়ে সিদ্ধান্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতামতের তোয়াক্কা না করে অ্যালকোহল বিধিমালা না মেনে প্লাস্টিকের বোতলে বাজারজাত করে।
অস্থায়ী লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ এবং বদলি বানিজ্য, বাংলা মদ প্লাস্টিকের বোতলজাতকরণ ও কেরুজ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সমলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছেন এমডি। তার চাহিদমতো ঘুষ না পাওয়ায় কয়েকটি ওয়্যার হাউজের ইনচার্জকে ঘন্টার ব্যবধানে বদলি আদেশের চিঠি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানোর ঘটনায় চলছে নানামুখি সমালোচনা। অভিযোগ রয়েছে, আখ চাষিদের সাথে বেড়েছে তার দূরত্ব বাড়ায় আসছে মৌসুমে ইক্ষুরোপণ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেরু এণ্ড কোম্পানীতে অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ৯ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কমিটি কেরু এণ্ড কোং এর দেশী মদ বোতলজাতকরন লাভজনক কিনা, দেশী মদ বোতলজাতকরনের উদ্যোগটি আইন মেনে কর্তৃপক্ষ অনুমোদন সাপেক্ষে হয়েছে কিনা, দেশী মদ বোতলজাত করনে সরক্ার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে কিনা এবং বেসরকারিখাত তা থেকে লাভবান হবে কিনা তা তদন্ত করে দেখবে। এছাড়াও গঠিত কমিটি দেশী মদ বাজারজাত করনে প্লাষ্টিক বোতল ক্রয় কোন পদ্ধতিতে করা হয়েছে, ক্রয় বিধিমালা অনুসরন করা হয়েছে কিনা, দেশী মদ ও ফরেন লিকারের উৎপাদন বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে কিনা , কেরু ্ণ্ড কোম্পানীর ওয়্যার হাউজের দায়িত্বে থাকা পূর্বের ইনচার্জগনের কাছ থেকে অর্থ দাবিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তে স্থান পাবে।
অভিযোগ রয়েছে, এমডি হিসেবে যোগদানের পর রাব্বিক হাসান উর্ধ্বতনদের নামে অধিনস্তদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে গত ১৫ মার্চ দেশের ১৩টি বণ্ডেড ওয়্যার হাউজ ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্টদের বরাবরে একটি অফিস আদেশ জারি করেন। যেখানে ব্যবস্থাপনার নামে অনৈতিক লেনদেন না করার জন্য নির্দেশনাও প্রদান করেন তিনি।
সূত্র মতে, এমডি ডিএনসিকে তোয়াক্কা না করেই চালিয়ে যাচ্ছে দেশী মদ বোতলজাতকরণ। কেরুর উৎপাদিত মদের বোতলের গায়ে উৎপাদনের তারিখ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখসহ অনেক শর্ত পূরণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমডি রাব্বিক হাসান বলেন, আমি কারো কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করিনি। যাদের বদলি করা হয়েছে সেটি উপর থেকে করা হয়েছে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রশিদুল হাসান বলেন, এসব নিয়ে এখন কোনো মন্তব্য করবোনা। বিভিন্ন মিডিয়ায় আসা অভিযোগগুলোর তদন্ত হচ্ছে।