সারাবিশ্বে সাংবাদিক হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

এম মতিউর রহমান মামুন

আমরা আরও এক প্রবীণ প্রগতিশীর কলম সংগ্রামীকে হারালাম। মেঘনা নদী ফিরিয়ে দিয়েছে তাঁর নিথোর মরদেহ। মৃত্যুর আগে আমাদের শিখিয়ে গেলেন ‘সত্য বলে বেঁচে থাকা কঠিন’। হ্যাঁ, তো বটেই, সাংবাদিকের কলমে সর্বদা সত্যের স্বয়ং প্রকাশ ঘটে। দূর্নীতি, অন্যায় অবিচার, ব্যাভিচার,অনাচার, খুন, ধর্ষণ লুটপাট, চাঁদাবাজি ,দখলদারিত্ব, হত্যা নির্যাতন ও সামাজিক অবক্ষয়ের হাজারো চিত্র ধারন করতে হয় সাংবাদিকের ক্যামেরায়। তাই হয়তো বর্ষীয়ান কলামিস্ট ও সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার ‘বিভু দা’ যাওয়ার আগে আমাদের জন্য রেখে গেলেন কিছু জিজ্ঞাসা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সারাবিশ্বে কোথাও না কোথাও প্রাণ দিতে হচ্ছে সাংবাদিকদের।

ইউনেস্কো: জানিয়েছে ‘যে, ২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরে বিশ্বজুড়ে ১৭০০ এর বেশি সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের ৮৫% মামলায় কোনো বিচার হয় না বা দোষীদের শাস্তি দেওয়া হয় না। এই তথ্যগুলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ধরনের ঘটনার দায়মুক্তি অবসানের জন্য কাজ করছে’। এ কথা পরিস্কার যে, কিছু কিছু রাষ্ট্রে সাংবাদিক হত্যার যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যান্ত ভয়াবহ। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রতিবেদনের তালিকায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিবেচনায় যেসব দেশের নাম আছে–– ফিলিস্তিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মেক্সিকো, সুদান, মিয়ানমার, কলম্বিয়া, ইউক্রেন এবং লেবানন।

রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী’, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ রেকর্ড। সিপিজে-এর তথ্য মতে, ১৮টি দেশে ১২৪ জন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হন, যার প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য ইসরায়েল দায়ী এবং এর বেশিরভাগই গাজায় ঘটেছে। ইউনেস্কো জানিয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১,৭০০ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮৫% মামলায় কোনো বিচার হয়নি’। ২০২২-২০২৩ সালে প্রতি চার দিনে একজন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব হত্যাকান্ডে জড়িতদের শাস্তি হয়নি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। ২০২২-২০২৩ সালে হত্যাকান্ডের শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে নারী সাংবাদিক ছিলেন ১৪ জন (নয় শতাংশ)’। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে): জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ১৮টি দেশে অন্তত ১২৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যা একটি রেকর্ড। এই হত্যাকান্ডের ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কিত, এবং এর বেশিরভাগই ফিলিস্তিনের গাজায় ঘটেছে।

 

 


এক বিবৃতিতে আল-জাজিরা এই হামলাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ড’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তাঁরা বলেছে, গাজা দখলের আগেই সংবাদ কর্মীদের কণ্ঠরোধ করার এটি একটি ‘বেপরোয়া চেষ্টা’। আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল ছিল গাজা। বিশ্বে এবছর যত সাংবাদিককে দায়িত্ব পালনের সময় হত্যা করা হয়েছে তার ৩০ শতাংশই ঘটেছে গাজায়, আর তাদের প্রায় সবাইকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ফিলিস্তিন এখন সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ। গত পাঁচ বছরে অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে এ বছর ফিলিস্তিনে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ১৪৫ জনেরও বেশি সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে দায়িত্ব পালনকালে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩৫ জনকে’।

ক’দিন আগের এক হামলায মোট সাতজন এ হামলায় নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আলজাজিরার সাংবাদিক আনাস আল-শরিফ (২৮) এবং তার তিন সহকর্মী : সংবাদদাতা মোহাম্মদ কুরেইকেহ (৩৩), ক্যামেরাপারসন ইব্রাহিম জাহের (২৫) এবং মোহাম্মদ নওফেল (২৯)। এটাই প্রথমবার নয় যে আলজাজিরার সাংবাদিকদের ইসরায়েল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বলে রাখা দরকার ইউক্রেনে কমপক্ষে ২৩ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। দোহা সেন্টার ফর মিডিয়া ফ্রিডম’ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় নিহত ১১০ জন পেশাদার বা নাগরিক সাংবাদিকের নথিভুক্ত করেছে। সিরিয়ান জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন বিদ্রোহের পর থেকে এবং গৃহযুদ্ধের সময় নিহত ১৫৩ জন সাংবাদিক এবং ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ১৫ জন সাংবাদিকের নথিভুক্ত করেছে।
যাহোক ক’দিন আগেও চাঁদাবাজির ছবি তোলার অপরাধে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কী নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এভাবে যদি সাংবাদিককে হত্যা করা হয় তাহলে মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত, নম্র -ভদ্র, বিনয়ী, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান, বিচক্ষণতা সম্পূর্ণ ছেলেরা এমন পেশায় আসবে বলে আমার মনে হয়না।

অপরাধীরা অপরাধ করবে আর সাংবাদিক তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। তাতে সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ মনে করা বিকৃত মানুষের পরিচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সংবাদকর্মী গঠনমুলক সমালোচনা করে রাষ্ট্র বা সমাজকে আলোকিত করে তা অপরাধ হতে পারেনা। মিডিয়া কর্মীদের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করলে সমাজে অন্ধকার আসবে তাতে সন্দেহ নেই। বিভু দা’র মতো বিশুদ্ধ কলম সংগ্রামী দীর্ঘজীবনে আলো হাতে অন্ধকারে বিরুদ্ধে অনেক লড়াই সংগ্রাম করেছেন কিন্তু শেষ জীবন এসে এমন অকরুণ অপমৃত্যু কারও নিশ্চয় কাম্য ছিলোনা। যাহোক সারাবিশ্বে অপ্রত্যশিতভাবে সাংবাদিক হত্যা ঘটনা ঘটেই চলেছে তা নিশ্চয়ই কারও কাম্য নয়। অচিরেই বিশ্ব নেতাদের পদক্ষেপ নিয়ে সাংবাদিক হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে।

 

লেখক-রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক, গবেষক ও কলাম লেখক।।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ