প্রসঙ্গ ডাকসু নির্বাচন: যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই…!

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

মো.ইউসুফ আলী-

চেয়েছিলাম অধিকার,হয়ে গেলাম রাজাকার! ’২৪এর ছাত্র আন্দোলনকে বেগবান করতে এটি ছিল একটি অন্যতম বিস্ফোরক স্লোগান। ঠিক একইভাবে এ দুনিয়াতে আমরা অনেক কিছুই চাই ,যা খুব সহজেই পাই না। কিংবা ভাবি এক আর হয়ে যায় আরেক। গত কালের ডাকসু নির্বাচনেও ঠিক তা-ই হয়েছে। আমিসহ আমরা দেশবাসী অনেকেই যা চেয়েছি তা হয়ত অনেকেই পাইনি। তবুও নব নির্বাচিতদেরকে অভিনন্দন শতবার। জানাই স্ব-শ্রদ্ধ লাল সালাম ও লাল গোলাপের শুভেচ্ছা।
তারপরও আজকের এ লেখাকে কেন্দ্র করে আমি আগে থেকেই বলে নিতে চাই যে, আমার আজকের লেখার শিরোনামের উল্লেখিত উক্তিটি বহুল প্রচারিত একটি প্রবাদ-প্রবচন কিংবা কবিগুরুর জনপ্রিয় কোন কবিতার পংতি হলেও আজ আমি এ উক্তিটি সদ্য সমাপ্ত ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে প্রকাশ করছি মাত্র তাও কিন্তু নয়। তবে আজকের লেখার এ উক্তিটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত মনোভাবের প্রকাশ মাত্র। কারন ব্যক্তি জীবনে আমি কোন রাজনৈতিক দলের লেজুর ভিত্তিক নই। তবে এদেশের রাজপথে হাটতে গিয়ে কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও বহু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার এ ৫৩ বছরের অরাজনৈতিক ব্যক্তি জীবনের ঝুড়িতে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সদ্য সমাপ্ত ডাকসু নির্বাচনে আমারও একটা মৌন সমর্থন ছিল কোন একটা অরাজনৈতিক প্যানেলের প্রতি। আর সেটি ছিল স্বতন্ত্র প্যানেল ও একজন নারী প্রার্থী উমামা ফাতেমার প্রতি। কারন ’২৪শের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক অনেক হিসেব-নিকাশ কষেই হয়ত আমার এ সমর্থন ছিল ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সাহায্যে আমরা জানতে পেরেছি যে, রাতভর নানা নাটকিয়তার পর গতকালের অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়েছে আজ বুধবার সকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন থেকে ঘোষিত চূড়ান্ত ফলাফলে এ তথ্য জানানো হয়। এতে ভিপি পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) এবং জিএস পদে এস এম ফরহাদ ও এজিএস পদে মহিউদ্দিন খান জয় পেয়ছেন।
চূড়ান্ত ফলের ঘোষণায় জানানো হয়েছে, ‘ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাদিক কায়েম ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৫ হাজার ৭০৮ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৮৯ ভোট পেয়েছেন। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম হোসেন পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট। জিএস পদে ছাত্রশিবিরের নেতা এস এম ফরহাদ ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামীম পেয়েছেন ৫হাজার ২৮৩ ভোট। এ ছাড়া প্রতিরোধ পর্ষদের মেঘমল্লার বসু পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট। এজিএস পদে ছাত্রশিবিরের নেতা মুহা. মহিউদ্দীন খান ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৪ ভোট। বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের এজিএস প্রার্থী আশরেফা খাতুন পেয়েছেন ৯০০ ভোট।
আমরা জানি, এবারের এ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা- ৩৯ হাজার ৮৭৪ জন। এর মধ্যে ছাত্রী-১৮ হাজার ৯৫৯ জন,আর ছাত্র- ২০ হাজার ৯১৫ জন। ভোটের হিসেব নিকেশ কষতে গিয়ে ঠিক এখান থেকেই উঠে এসেছিল আমার চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটিও। কিন্তু না ভোটাররা তাদের স্বচ্ছ ভোট দানের মাধ্যমে দেশবাসীর সকল চাওয়া-পাওয়াকেই পাল্টে দিয়েছেন। সুতরাং যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই যাহা চাই তাহা পাই না। তবে আমি মনে করি এ নির্বাচন নিয়ে আমি তেমন বেশি কিছু চাইনি। আর, যা চেয়েছি তা পাবার যোগ্যতা যে আমার ছিল না তাও নয়। কারন নারী ভোটাররা যদি সকল দল-মতের উর্ধ্বে উঠে তাদের নারী প্রার্থীর প্রতি সহানুভুতি দেখিয়ে একচেটিয়া নারী প্রার্থীকেই সমর্থন জানিয়ে যেত তাহলে হয়ত ভোটের হিসেব নিকাশ পাল্টে যেতেও পারত। উমামা ফাতেমার প্রতি আমার ব্যক্তিগত মৌন সমর্থনটাও ছিল সে দিক থেকেই।
আমরা জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)কে বলা হয় দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন-সংগ্রামের তীর্থভূমি বলেও পরিচিত ডাকসু। বায়ান্ন, বাষট্টি, ছিষট্টি, উনসত্তর, সত্তর, একাত্তর, নব্বই ও চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার এটি। তাই ৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত এবারের এ ডাকসু নির্বাচন রাজনৈতিক দল ও পক্ষের জন্য এসিড টেস্ট হিসেবে মনে করা হচ্ছিল। কারন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য ডাকসু নির্বাচন একটি বার্তা হতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। তাই এ নির্বাচনকে ঘিরে এখনও পর্যন্ত দেশজুড়ে বিরাজ করছে টান টান উত্তেজনা। তবে ছাত্রদল বা অন্যান্য সব প্রার্থীর কাছ থেকে ভোট জালিয়াতির যেসব অভিযোগ এসেছে। সে কথা যথারীতি উড়িয়ে দিয়েছেন উপাচার্য মহোদয়। নির্বাচনে কোনও কারচুপি হয়নি, বরং একটি মডেল নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করেছেন উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান। তর্কের খাতিরে সেগুলোকে সত্যি ধরে নিলেও প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান এত বেশি হওয়ার কথা না। সাধারণত দেখা যায়, কোনো ভোটে জালিয়াতি হলে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান খুব কম থাকে। ফলে শুধুমাত্র জালিয়াতির কারণে ছাত্রদলের প্যানেল ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে বলে ধরে নেয়ার অবকাশ নেই। লক্ষ্য করলে দেখবেন, কোনো কোনো হলে ছাত্রদলের আবিদকে ছাড়িয়ে গেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা, কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম হোসেন। একচেটিয়া জালিয়াতি হলে এরা এত ভোট পাওয়ার কথা না।
এখন সমস্ত অভিযোগ থেকে বেড়িয়ে বিএনপির উচিত আত্মসমালোচনা করা। ময়নাতদন্ত করে আসল কারণ উদঘাটন করা। দেশবাসীর ধারনা ছিল ছাত্রলীগ বিহীন এবারের এ ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে প্যানেলসহ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করবেন। কিন্তু তাদের সে ধারনাকে উড়িয়ে দিয়ে একচেটিয়া বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ছাত্রশিবির। তাহলে আমরা কি একথা ধরেই নিব যে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী যা বলেছেন বলেছেন, তা যথার্থই বলেছেন ? সম্প্রতি বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা তার জেলা শহরের নিজস্ব বাসভবনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন যে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জামায়াতের লোক। বিভিন্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের বিচারক যারা হচ্ছে, তারা জামায়াতের লোক। আর আমরা কী করছি? লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট দখল করছি। এ সময় আলতাফ হোসেন চৌধুরী তার নিজ জেলার নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন,শুধু নেতা হলেই হবে না, নেতার কোয়ালিটি থাকতে হবে। নেতা যদি মনে করে চান্দাবাজি করাই তার কাজ, দখলবাজি করাই তার কাজ, তাহলে নেতৃত্ব দেবে কখন? ডাকসু নির্বাচনে ভরাডুবির পর আজ আবার আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সেই বক্তব্য যথার্থই বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয়ের পর জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশব্যপী চাঁদাবাজী দখলবাজীর প্রভাবকে তুলে ধরে নানা মন্তব্য করেছেন নানা জন। কেউ কেউ লিখছেন চান্দা ভাইদের সারা দেশের লুটতরাজের প্রভাব ডাকসুর নির্বাচনে। এছাড়াও অনেকেই আরো অনেক ধরনের মন্তব্য করেছেন বিএনপিকে ঘিরে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা দেশজুড়ে দখলবাজির যেসব নজির সৃষ্টি করেছে, তাতে মানুষ বিরক্ত। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব ডাকসু নির্বাচনে পড়েছে কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এটা তো ট্রেলার মাত্র, বড় খেলা তো সামনে এমনটাও মনে করছেন অনেকে।

লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক ।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ