শহিদুল ইসলাম খোকন, গাইবান্ধা:
গাইবান্ধায় বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রবল আপত্তি থাকা সত্তে¡ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (নেসকো) কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক চালু করছে ডিজিটাল প্রিপেইড মিটার। আধুনিক প্রযুক্তির নাম করে এই উদ্যোগ নেয়া হলেও গ্রাহকদের কাছে এটি এখন টাকা মারার যন্ত্র। রিচার্জ করা টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা খাতে, অথচ ব্যাখ্যা দিতে নারাজ বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় যে-সব পরিবার প্রিপেইড মিটার পেয়েছেন, তাদের অভিযোগ- হাজার টাকা রিচার্জ করলেই তাৎক্ষণিক কেটে নেয়া হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। কেউ বলেন, ভ্যাট-ট্যাক্স বা সার্ভিস চার্জ, আবার কেউ বলেন ডিমান্ড চার্জ। কিন্তু কোন খাতে কত টাকা যাচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই কর্তৃপক্ষের নিকট। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মিটারে ব্যবহারের হিসাবও অস্বাভাবিক দ্রæত ফুরিয়ে যায় টাকা।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার ধানঘড়া এলাকার মাবিয়া বেগম বলেন, ‘এক হাজার টাকা রিচার্জ করতেই ২৫০ টাকা কেটে নেয়া হয়। বাকি টাকায় তিন দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ শেষ হয়ে যায়। আগে পোস্টপেইড মিটারে মাসে ৮০০ টাকার মতো বিল আসত, এখন আড়াই হাজার টাকাতে হয় না।
শহরের পলাশ পাড়ার গৃহিণী তৃষ্ণা রাণীর অভিজ্ঞতাও একই। ‘আগে মাসে ৭০০ টাকায় কাজ চলত, এখন সপ্তাহে ৫০০ টাকা করে রিচার্জ করতে হয়,’ তিনি বলেন, ‘কীসে টাকা কাটা হয়, বুঝতে পারি না। শুধু দেখি ব্যাল্যান্স শূন্য।’
এমন অভিজ্ঞতা শুধু কয়েকজনের নয়- গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়ও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রিপেইড মিটার চালুর পর বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক হাড়ে বেড়ে যাওয়ায় হতবাক সাধারণ মানুষ ।
ডবদ্যুৎ বিভাগ বলছে, প্রিপেইড মিটার বিল পরিশোধের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, গ্রাহক নিজেই ব্যবহারের পরিমাণ বুঝতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মিটারটি যে তথ্য দেয় তা গ্রাহকের কাছে দুর্বোধ্য। অনেকেই বলেন, তারা কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন আর কত টাকা কাটা হয়েছে- দুটি হিসাবের কোনো মিল থাকে না।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা নেসকো-১ ও নেসকো-২ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি। কেউ ফোন ধরলেও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন।
স্থানীয়ভাবে গঠিত ‘গাইবান্ধা ডিজিটাল প্রিপেইড মিটার প্রতিরোধ কমিটি’র আহŸায়ক গোলাম রব্বানী মুসা বলেন, ‘গ্রাহকদের সঙ্গে খামখেয়ালি আচরণ করছে নেসকো। অতিরিক্ত বিল, ভুল হিসাব আর অযৌক্তিক চার্জে মানুষ ক্ষুব্ধ। অভিযোগ নিয়েও তারা চুপ। আমরা চাই, প্রতিটি টাকার ব্যাখ্যা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক।’
বিদ্যুৎ সেবাখাত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলোতে বিলিং ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার জন্য চালু হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি ‘রেভিনিউ রিকভারি টুল’ হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, গ্রাহকবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে নয়।
তারা বলেন, এই মিটারের কয়েকটি বড়ো অসুবিধা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, চার্জ-রিচার্জের সময় ট্যাক্স, সার্ভিস ফি, ডিমান্ড চার্জ, মিটার রেন্টসহ নানা খাতে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে মোট রিচার্জের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। দ্বিতীয়ত, অস্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থা- মিটার স্ক্রিনে দেখানো তথ্য গ্রাহকদের কাছে দুর্বোধ্য, ফলে তারা বুঝতে পারেন না কোন খাতে কত টাকা গেছে। তৃতীয়ত, রাতের ভেতর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি- ব্যাল্যান্স শেষ হয়ে গেলে হঠাৎ বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়, যা জরুরি সময় বা চিকিৎসা-নির্ভর পরিবারে চরম বিপদ তৈরি করে। চতুর্থত, গ্রাহক সেবা অনুপস্থিত- রিচার্জ সমস্যা, মিটার বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ভুল হিসাবের বিষয়ে অভিযোগ জানানোর পরও কোনো কার্যকর প্রতিকার মেলে না।
সচেতন বিদ্যুৎ গ্রাহকরা মনে করেন, প্রযুক্তি ব্যবহার মানেই উন্নয়ন নয়; এটি তখনই কার্যকর হয় যখন প্রশাসন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রাহকবান্ধব হয়। গাইবান্ধার অভিজ্ঞতা তার উলটো চিত্র দেখাচ্ছে। গ্রাহকদের প্রত্যাশা এখন একটাই- বিলিংয়ে ন্যায্যতা, চার্জ কাঠামোতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক সেবা। তাদের কথায়, ‘প্রযুক্তি নয়, আমাদের দরকার বিশ্বাস। বিদ্যুৎ পেতে চাই, ঠকতে চাই না।’