রবিউল ইসলাম :
সরকারের এক অতিরিক্ত সচিব এবং নৌ পুলিশের বর্তমান এক অতিরিক্ত ডিআইজি দম্পতির বিরুদ্ধে প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে এক ব্যবসায়ীকে চরম হয়রানি ও সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী এ এস এম জুলফিকার হায়দার এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেন। অভিযুক্তরা হলেন অতিরিক্ত সচিব শামীমুজ্জামান এবং তার স্ত্রী নৌ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি জেসমিন বেগম।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ব্যবসায়ী জুলফিকার হায়দার জানান, অভিযুক্ত শামীমুজ্জামান ও জেসমিন বেগম সম্পর্কে তার আত্মীয় হন। সেই সুবাদে ২০০৭ সালে একটি প্লট পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তারা জুলফিকারের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেন। পরবর্তী সময়ে টাকা ফেরত দিতে না পেরে নিজেদের সরকারি চাকরি রক্ষার্থে সেগুনবাগিচায় একটি ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য ওই ব্যবসায়ীকে অনুরোধ করেন তারা। তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে ও নগদে মোট ৪৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে ফ্ল্যাটটি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্ত আমলা দম্পতি তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন। ফ্ল্যাটটি তাদের নামে ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ী জুলফিকারকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। একপর্যায়ে পরিবারের নিরাপত্তা ও মামলার ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নামমাত্র মূল্যে ফ্ল্যাটটি পুনরায় ওই দম্পতির নামে লিখে দিতে বাধ্য হন। বিগত দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ওই দম্পতি রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থেকে এই হয়রানি ও জুলুম বজায় রাখেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই অন্যায় ও সম্পত্তি আত্মসাতের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠানো এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ দেওয়ার পর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হয়রানি আরও তীব্র করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
ব্যবসায়ী জুলফিকার হায়দার অভিযোগ করেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওই দম্পতি থানা পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তার নামে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করিয়েছেন। এমনকি এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও তাকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে মামলার বাদীগণ আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন যে উক্ত ব্যবসায়ী এসব মামলার আসামি নন। একই সাথে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরও একাধিক হত্যা মামলায় তাকে মিথ্যাভাবে জড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, যা পরবর্তীতে তদন্তে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত অতিরিক্ত সচিব শামীমুজ্জামান ও অতিরিক্ত ডিআইজি জেসমিন বেগম দম্পতির নামে- বেনামে থাকা দেশে ও বিদেশে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের এক চাঞ্চল্যকর বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকাশিত বিবরণী অনুযায়ী, পটুয়াখালীর দুমকিতে ৩ একর জমির ওপর একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন এই দম্পতি। এছাড়া পটুয়াখালীর বিভিন্ন দলিলে তাদের নামে মোট ৪৪৬ শতাংশ জমি রয়েছে। পটুয়াখালী জেলা শহরে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পাশাপাশি কলাপাড়ায় নিজস্ব ও যৌথ নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন তারা। ঢাকার বাইরে দিনাজপুরেও ১০ একরের অধিক জমিতে বিশাল আম ও লিচু বাগান এবং খান মার্কেটে ৩৩ শতাংশ জমি কেনার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। শুধু ঢাকার বাইরেই নয়, রাজধানী ও এর আশেপাশেও এই দম্পতি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটিতে তাদের ১২ কাঠার একটি বিশাল প্লট রয়েছে। এছাড়া সেগুনবাগিচার অভিজাত তনাকা টাওয়ারে রয়েছে ১৮২৫ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রজেক্টে ৩ কাঠা, বসুন্ধরা ৩০০ ফুট সংলগ্ন পুলিশ হাউজিংয়ে ৪ কাঠা এবং পটুয়াখালী ও কেরানীগঞ্জের নিউ ভিশন হাউজিংয়ে এই দম্পতির মোট ২০ কাঠার প্লট রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, কেবল জমি ও ফ্ল্যাটই নয়, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকসহ বিশ্বখ্যাত এইচএসবিসি ব্যাংক এবং সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকেও এই আমলা দম্পতির কয়েক শত কোটি টাকা জমা রয়েছে। বর্তমানে আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে তারা কানাডায় বিলাসবহুল বাড়ি ক্রয় করে দেশত্যাগের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ী জুলফিকার হায়দার নিজের ও তার পরিবারের জানমালের চরম নিরাপত্তা হীনতার কথা উল্লেখ করে নিরাপত্তা দাবি করেন। একই সাথে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের এই বিপুল অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (ঘইজ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি বিনীত ও জোর অনুরোধ জানিয়েছেন।