দূর্ঘটনার মিছিল বাড়ছেই ১২ দিনে নিহত ৩শ আহত সহস্্রাধিক ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট-আণাড়ি চালক দায়ি

বিশেষ প্রতিনিধি
নিরাপদ ভ্রমনের গ্যারান্টি নেই। কোথাও নেই স্বস্তি। নৌপথ, রেলপথ সড়কপথে দূর্ঘটনা বেড়েই চলছে। একের পর এক দূর্ঘটনার ভাবিয়ে তুলছে সকলকে। সম্প্রতি কয়েকদিনের দূর্ঘটনায় হতাহতের পূর্বের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ঈদের আগে পরে কয়েকদিনে বিভিন্ন দূর্ঘটনায় ঝড়ে গেছে প্রায় তিনশ’ প্রাণ। আহত হয়েছেন শতাধিক। গতকালও রাজধানীতে ২ জনসহ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছে ১০ জন। এর মধ্যে কুমিল্লায় বেপরোয়া বাস চাপায় প্রাণহানি ঘটেছে রিকশারোহী ৭ যাত্রীর।

এর আগে মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছেন স্ত্রী-সন্তানসহ একই পরিবারের ৫ জন।
এবার এবার ঈদযাত্রায় রেল, নৌ ও সড়ক পথে ২৪৪টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দূর্ঘটনায় মারা গেছে ২৫৩ জন যাত্রী। ৯০৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সড়কেই ২০৩টি দুর্ঘটনায় ২২৪ জন নিহত, ৮৬৬ জন আহত হন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান মতে, ঈদের আগে ও পরে ১২ দিনে এসব ঘটনা ঘটে।

গতকাল রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি- সাগর-রুনি মিলনায়তনে ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০১৯ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, এবারের ঈদে বিগত বছরের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা ৬.৪০ শতাংশ, নিহত ৬.২৫ শতাংশ ও আহত ১.৫০ শতাংশ কমেছে। এ বছর মোট সংঘটিত ২০৩টি সড়ক দুর্ঘটনার ৬৭টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অন্য যানবাহনের সংঘর্ষে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ।

যেখানে মোট নিহতের ৩৪.৩৭ শতাংশ এবং মোট আহতের ৮.৪২ শতাংশ। ঈদযাত্রায় শুরুর দিন ৬ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে ফেরা (১৭ আগস্ট) পর্যন্ত গত ১২ দিনে ২০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৪ জন নিহত ও ৮৬৬ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৩৭ জন চালক, ৩ জন শ্রমিক, ৭০ জন নারী, ২২ জন শিশু, ৪২ জন ছাত্র-ছাত্রী, ৩ জন সাংবাদিক, ২ জন চিকিৎসক, ৮ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন রাজনৈতিক নেতা, ৯০০ জন যাত্রী ও পথচারী সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনা ৫২.২১ শতাংশ ঘটেছে।

আগামী ঈদে এ দুটি ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৮৫.২১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে উলেখ করেন তিনি। উল্লেখিত সময়ে রেল পথে ট্রেনে কাটা পড়ে ১১টি, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ১টি, ট্রেন যানবাহন সংঘর্ষে ১টি, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ১টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে নৌ-পথে ২৪টি ছোটখাট বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৫৯ জন নিখোঁজ ও ২৭ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য ৪১টি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক ১১টি অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে।

বিগত ৪ বছরের পবিত্র ঈদুল আজহায় ঈদযাত্রায় সড়ক পথে দুর্ঘটনার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ১৯৩ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৪৮ জন, আহত ১ হাজার ৫৫ জন, ২০১৭ সালে ২১৪ দুর্ঘটনায় নিহত ২৫৪ ও ৬৯৬ আহত, ২০১৮ সালে ২৩৯ দুর্ঘটনায় নিহত ২৫৯ জন, আহত ৯৬০ জন এবং এবারের ঈদুল আজহায় ২০৩ দুর্ঘটনায় নিহত ২২৪ জন, আহত ৮৬৬ জন। দুর্ঘটনার পাশাপাশি নিহতের সংখ্যা কমেছে। দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭.৪ শতাংশ বাস, ২৬.৩৩ শতাংশ মোটরসাইকেল ১৬.৪ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, লরি, ৭.৮২ শতাংশ কার-মাইক্রো, ১৩.৫২ শতাংশ অটোরিকশা, ৩.৫৫ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৪.৯৮ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

সংঘটিত দুর্ঘটনার ২১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৫২.২১ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনা, ১৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায় ও ৯.৮৫ শতাংশ অনান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআরটিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ,যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান তাওহিদুল হক লিটন। এদিকে রাজধানীতে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় দু’জন মারা গেছেন। এদের একজন উত্তর বাড্ডায়, অন্যজন তুরাগ কামাড়পাড়ায় এলাকায়।

নিহতদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। শাকিল নামের একজন পথচারী জানান, শহিরুল’র (৪৫) সঙ্গে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে তার নাম-পরিচয় জানা গেছে। তিনি কাঁচামাল ব্যবসায়ী। বাবার নাম মৃত সাইদুল ইসলাম। থাকেন উত্তর বাড্ডায়। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা কলমাকান্দা চারিকুমারপাড় গ্রামে। তিনি আরও জানান, রোববার সকাল ৭টার দিকে উত্তর বাড্ডা ওভারব্রিজের নিচে একটি পরিবহন শহিরুলকে ধাক্কা দেয়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি।

উদ্ধার করে ঢামেকে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে শনিবার রাত ১১টার দিকে তুরাগ কামাড়পাড়া ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একতা পরিবহনের একটি বাস অজ্ঞাত (৬০) এক বৃদ্ধাকে ধাক্কা দেয়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঢামেকে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ঘোষণা করেন।

আপনার মতামত লিখুন :