বিশ্ব ইরানের সঙ্গে ‘রাজনৈতিক সমাধানে’ আগ্রহ সৌদি যুবরাজের

রোববার সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে সামরিক নয়, রাজনৈতিক সমাধানই তার বেশি পছন্দ।

মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিবিএসের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে শাসক হিসেবে সাংবাদিক জামাল খাশুগজি হত্যার ‘পূর্ণাঙ্গ দায়’ নেয়ার কথা জানালেও যুবরাজ ওই হত্যাকাণ্ডে নির্দেশ দেওয়ার কথা সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বছরখানেক আগে তুরস্কের সৌদি কনসুলেটে খাশুগজির হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

“বিশ্ব যদি ইরানকে নিবৃত্ত করতে দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, আমরা আরও উত্তেজনা দেখতে পাবো, যা বিশ্বকেই হুমকিতে ফেলবে। তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে এবং তেলের দাম জীবদ্দশায় দেখিনি এমন অকল্পনীয় আকাশচুম্বী অবস্থানে পৌঁছাবে,” বলেছেন সৌদি যুবরাজ।

গত সপ্তাহের মঙ্গলবার নেওয়া এ সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ বলেছেন, তিনি চলতি মাসের ১৪ তারিখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি শোধনাগারসহ দুটি তেল প্ল্যান্টে হামলায় ইরানের দায় নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পস্পেওর অবস্থানের সঙ্গে একমত।

সৌদি আরবের তেল শিল্পক্ষেত্রের প্রাণকেন্দ্রে ওই হামলায় বিশ্বের তেল সরবরাহের পরিমাণ পাঁচ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ও সৌদি আরব এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান তা অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরানঘনিষ্ঠ হুতি বিদ্রোহীরা হামলাটির দায় স্বীকার করেছে।

সাক্ষাৎকারে এমবিএস হিসেবে সুপরিচিত যুবরাজ জানান, তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধান চান, কেননা সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে কোনো যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে।

“রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান সামরিক উপায়ের চেয়ে বেশি ভালো,” বলেছেন তিনি।

তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দেশটির প্রভাববিস্তার রোধে ইরানের সঙ্গে নতুন একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় রুহানি ও ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠক আয়োজনে ইউরোপের দেশগুলো চেষ্টা করলেও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

তুরস্কের সৌদি কনসুলেটে খাশুগজি হত্যাকাণ্ডের বর্ষপূর্তির কয়েকদিন আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই ঘটনার বিষয়টিও উঠে আসে। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে যুবরাজের উত্তর ছিল, “একেবারেই না।”

তবে হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াননি তিনি।

“যেহেতু এটি সৌদি সরকারের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা করেছে,তাই এর সম্পূর্ণ দায় নিচ্ছি আমি। এটা ভুল ছিল। ভবিষ্যতে যেন এরকম না হয়, সেজন্য অবশ্যই সব ধরনের পদক্ষেপ নেবো আমি,” বলেছেন তিনি।

তুরস্কের সৌদি কনসুলেটে খাশুগজি হত্যার পর পশ্চিমা বিভিন্ন সরকার এমনকী সিআইয়ের মূল্যায়নেও এমবিএসই ওই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল। সৌদি কর্মকর্তারা অবশ্য শুরু থেকেই হত্যাকাণ্ডে যুবরাজের কোনো ধরনের ভূমিকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

“অনেকেরই ধারণা, সৌদি আরবের সরকারের হয়ে কাজ করা ৩০ লাখ লোকের প্রতিদিনের কাজ সম্পর্কে আমার জানা উচিত। এটা অসম্ভব যে ওই ৩০ লাখ লোক তাদের প্রতিদিনের কাজের প্রতিবেদন সৌদি সরকারের শীর্ষ বা দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তাকে পাঠাবেন,” বলেছেন তিনি।

খাশুগজি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি আরবে তদন্ত চলছে জানিয়ে, দোষী প্রমাণিত হলে পদবী যাই হোক না কেন তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

“কেউ বাদ থাকবে না,” বলেছেন তিনি।

সৌদি আরবের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সমালোচকখ্যাত খাশুগজি গত বছরের ২ অক্টোবর তুরস্কের সৌদি কনসুলেটে প্রবেশের পর থেকেই তাকে আর দেখা যায়নি। প্রথম দিকে সৌদি আরব খাশুগজির নিখোঁজকাণ্ডে দায় অস্বীকার করলেও তাকে যে কনসুলেটের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে পরে তা স্বীকার করে নেয়।

এ ঘটনায় গোপনে ১১ সৌদি নাগরিকের বিচার শুরু হলেও মাত্র কয়েকটি শুনানি হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে খাশুগুজি খুনের ঘটনায় সৌদি যুবরাজ এবং জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :