কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ডাক্তারের ভূমিকায়

আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু,কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জিহাদ হাসান সার্জিক্যাল ডাক্তারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ডিউটি ফাঁকি দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশন করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর ধারাবাহিকতায় জিহাদের ভুল অপারেশেনের শিকার হয়ে কোহিনুর আক্তার (৩৫) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার প্রাগপুর বাজারের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে রোববার এ ঘটনা ঘটে। যদিও এটি নতুন ঘটনা নয়, এ উপজেলার অনুমোদনহীন ক্লিনিকগুলোয় প্রায়ই এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। মানুষের সেবার বদলে ক্লিনিকগুলো মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়ুরা পালপাড়া গ্রামের আরসেদ আলীর মেয়ে প্রসূতি কোহিনুর আক্তারের প্রসব ব্যথা ওঠে শনিবার রাতে। ওই রাতেই তাকে প্রাগপুর বাজারের আল্লার দান প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। রোববার সকাল ৮টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্স) জিহাদ হাসান কোহিনুরের সিজারিয়ান অপারেশন করেন।

অপারেশন শেষ করে জিহাদ সেখান থেকে ফিরে যান। কিন্তু তার ভুল অপারেশনের ফলে কোহিনুরের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীরা ২ ব্যাগ রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেন। এরপর বেলা ১২টার দিকে প্রসূতি কোহিনুরের অবস্থার অবনতি ঘটলে ক্লিনিক মালিক পাপিয়া বেগম তড়িঘড়ি করে মাইক্রোবাসে করে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে পৌঁছলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রসূতি কোহিনুর আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। সে সময় ক্লিনিকের মালিক পাপিয়া বেগম হাসপাতাল থেকে সটকে পড়েন। কোহিনুর মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার করমদি গ্রামের রতন আলীর স্ত্রী। এদিকে কোহিনুরের মৃত্যুর পর প্রাগপুর বাজারের আল্লার দান প্রাইভেট ক্লিনিকের স্টাফরা ক্লিনিক বন্ধ করে পালিয়ে যান। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য বিকালে স্থানীয় সাংবাদিকরা ওই ক্লিনিকে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখতে পান।

তবে বাইরে অবস্থানরত আম্বিয়া খাতুন নামে ক্লিনিক সংশ্লিষ্ট এক নারী জানান, ক্লিনিকটিতে কোহিনুরের সিজারিয়ান অপারেশনের সময় তিনিও তার স্বজনদের সাথে ছিলেন। সকাল ৮টার দিকে জিহাদ হাসান এই অপারেশন করেন বলে তিনি নিশ্চিত করেন। প্রাগপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কথিত ডাক্তার জিহাদ হাসানকে দীর্ঘদিন ধরে ওই ক্লিনিকে নিয়মিত যাওয়া আসা করতে দেখা যায়। কিন্তু তারা জিহাদের আসল পরিচয় জানতেন না।

এতদিন ধরে হাসপাতাল কর্মচারী জিহাদকে ডাক্তার হিসেবেই চিনতেন। এদিকে ঘটনার পর থেকে জিহাদ হাসান গা ঢাকা দিয়েছেন। আত্মগোপন করেছেন ক্লিনিক মালিক পাপিয়া বেগমও। বক্তব্য নেয়ার জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের দুজনের ফোন খোলা পাওয়া যায়নি। তবে অজ্ঞাত স্থান থেকে গোপনে তারা বিষয়টি মিমাংসার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন। অভিযুক্ত জিহাদ স্থানীয় কতিপয় সাংবাদিককে ম্যানেজের প্রস্তাব দিলেও দরকষাকষিতে তা আটকে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম মুকুল সাংবাদিকদের বলেন, আমি জেনেছি জিহাদ নামের যেই ছেলেটি প্রসূতি কোহিনুরের অপারেশন করেছে সে দৌলতপুর হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজশ করে একজন হাসপাতাল কর্মচারী ডাক্তারের ভূমিকা পালন করছে। মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বা ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্স জিহাদ হাসান তার সরকারি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন অবৈধ প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়মিত সিজারিয়ান অপারেশন করে আসছেন। তিনি একজন কর্মচারী তা জানা সত্ত্বেও ক্লিনিক মালিকরা অধিক মুনাফা লাভের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচে তাকে দিয়ে অপারেশন করান। দালাল বেষ্টিত এসব অবৈধ ক্লিনিকের কর্তৃপক্ষ রোগী ও তাদের স্বজনদের জিম্মি করে জিহাদকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেন।

বেশভুষা দেখেও বোঝার উপায় থাকে না, জিহাদ আসলে ডাক্তার নাকি এমএলএসএস লেভেলের ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্স। সূত্র মতে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে সরকারি অনুমোদনহীন বেশ কয়কেটি প্রাইভেট ক্লিনিক। শুধু জিহাদই নন। তার মতো আরো অনেক ভুয়া ডাক্তার ক্লিনিকগুলোতে অপারেশনের কাজ করে আসছেন। এই অবৈধ ক্লিনিকগুলোর কর্তৃপক্ষ মানুষের সেবা তো দূরের কথা, তাদের পকেট কাটায় ব্যস্ত থাকেন। ক্লিনিকগুলো সেবার পরিবর্তে মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

ভুয়া ডাক্তারদের ভুল অপারেশনে প্রায়ই রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরে রোগীর স্বজনদের সাথে রফার মাধ্যমে আইনি জটিলতা এড়ানো হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অরবিন্দু পাল জানান, ইমার্জেন্সি অ্যাটেনডেন্স জিহাদ কর্তৃক অপারেশন সংক্রান্ত একটি ঘটনার খবর পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দৌলতপুর থানার ওসি এস এম আরিফুর রহমান জানান, প্রাগপুরের একটি ক্লিনিকে ভুল অপারেশনে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় তার পিতা আরসেদ আলী বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। সোমবার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়না তদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ময়না তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :