কাল্বে জোনাস ঢাকী-মালেকের লুটের রাজত্ব

হাসান-উজ-জামান
বর্তমান ও সাবেক কমিটির তিন কর্মকর্তার দুর্নীতির কারনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বেসরকারি ধৃণদান সংস্থা দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ লিঃ কালব নামে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযুক্ত এই তিন ব্যক্তি হলেন, কাল্বের সাবেক চেয়ারম্যান সাইমন এ. পেরেরা, বর্তমান বোর্ডের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারী এমদাদ হোসেন মালেক। তাদের পারস্পরিক যোগসাজসে সমবায়ী সমিতির সদস্যদের অর্থ লুটপাটে কালব আজ লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। লোকসান হচ্ছে প্র্রতিমাসে ৮০ লাখ টাকা । নাম সর্বস্ব এরিয়ান কেমিকেল কোম্পানীতে অপবিনিয়োগকৃত ৯৭ কোটি টাকাসহ মোট ১শ’২০ কোটি টাকা বর্তমান চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারী এবং সাবেক বোর্ডের চেয়ারম্যানের যোগসাজসে বেহাত হয়ে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে কেবল অর্থ লোপাটের জন্যে বিনা প্রয়োজনে সাবেক বোর্ড এবং বর্তমান বোর্ডের চেয়ারম্যান-সেক্রেটারী কুচিলা বাড়িতে ভবন ও রিসোর্ট নির্মানের নামে ৭৫ কোটি টাকা অপবিনিয়োগ করেছে। এরমধ্যে অর্ধেক টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টগণ মনে করেন। অব্যাহত লোকসান সত্তে¡ও বিনা প্রয়োজনে কেবলমাত্র টাকা লোপাটের জন্যে ঢাকী-মালেক ১ কোটি ৪০ লাখ টাকায় গাড়ী আমদানী করেছে। এখানেও অর্ধেক টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। নানা পন্থায় ঢাকী-মালেক সমবায়ীদের টাকা অপচয় ও আত্মসাৎ করে চলছে। বর্তমান বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের মতামত নেয়া হয়না। সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন চেয়ারম্যান-সেক্রেটারী। প্রতিবাদী ২ জন বোর্ড সদস্য কে বিধি বহির্ভুতভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

অন্য সদস্যদের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে। ফলে ঢাকী-মালেক সকল ক্ষেত্রে বেপরোয়া আচরণ করছে। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করছে সমবায় অধিদপ্তরের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা। যে কারনে আমানতকারী সমবায়ী সদস্যদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে রয়েছে সংশয়। এরকম ঝুঁিকপূর্ণ অবস্থা দেখে সমবায় অধিদপ্তর কাল্বের ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের অডিট রিপোর্টে দ্রæত একজন সরকারী কর্মকর্তা-কে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেছে।

বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটির বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি উৎঘাটন করে সমাধানের দায়িত্ব বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির উপর বর্তায়। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান মি. জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি মি. এমদাদ হোসেন মালেক এই দুইজন বাকী ১০ জন বোর্ড সদস্যের অনেক সময় মতামত প্রকাশের সুযোগ না দিয়ে বা মতামত দিলেও তা আমলে না নিয়ে উক্ত দুইজনই সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি দু’জনেই অন্য কারো মতামত না নিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী বোর্ড সভায় উপস্থাপন করে জোর পূর্বক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, আবার অনেক সময় বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয় না এবং বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক সমবায় আইরনর তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো কাজ করছেন। পূর্বের কমিটির মতোই কাল্ব ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতি করেছেন এ চক্র। চেয়ারম্যান মি. জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি মি. এমদাদ হোসেন মালেক ব্যক্তিগতভাবে অবৈধ অর্থ আয়ের উদ্দেশ্যে বোর্ডের অনুমোদন ব্যতিত বিল পরিশোধ করেছেন। ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য একটি উপ-কমিটি গঠন করা হলেও উপ-কমিটির চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়াই চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি চ‚ড়ান্ত বিল পরিশোধ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

সাবেক নিবন্ধক ও মহাপরিচালক উক্ত প্রকল্প পরিদর্শন করে – কাল্ব-এর পক্ষে উক্ত প্রকল্প পরিচালনা করার ক্ষমতা নেই মন্তব্য করেছেন, সেজন্য প্রকল্প বিক্রয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। তা সত্বেও বর্তমান বোর্ড উক্ত প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে ১০ কোটি টাকার অধিক ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে উক্ত প্রকল্পে সর্বশেষ নির্মাণ ব্যয়ের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। গঠিত উপ-কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ সম্পাদনের প্রক্রিয়া করা হয়। চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ক্ষমতার অপব্যবহার করে উপ-কমিটিতে একক সিদ্ধান্তে শিশু ও নারী নির্যাতন মামলার চার্জশীটভ‚ক্ত আসামীকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেন। বোর্ডের ১০ জন সদস্য প্রতিবাদ করে উক্ত আসামীকে কমিটি থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করলেও জোনাস ঢাকী তাকে বাদ দেননি।

নানা অভিযোগের কারণে সাব-কমিটি থেকে অধিকাংশ বোর্ড সদস্যই পদত্যাগ করেছেন। রিসোর্ট নির্মাণের জন্য টেন্ডার করা হয়, সেখানে তাদের নিজস্ব লোকের বাইরে টেন্ডার আসতে দেয়া হয়নি। অনিয়মের কারণে কতিপয় বোর্ড সদস্যগণ প্রতিবাদ করে কাজ বন্ধ রাখার প্রস্তাব করেছে, লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। জোনাস ঢাকী ও মালেক অত্যন্ত নি¤œমানের মালামাল দিয়ে কাজ করে ব্যাপক দুর্নীতি করে অবৈধভাবে প্রায় ১০-১৫ কোটি আত্মসাৎ করেছেন। উক্ত প্রকল্পে সমিতির প্রতিমাসে প্রায় ১ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটি এরিয়ান কোম্পানীতে ২০ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়, ৭৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে ঋণ প্রদান করেছে। কিন্ত কাল্ব চেয়ারম্যান হিসেবে জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক উক্ত ৯৭ কোটি টাকা উদ্ধারে অনীহা প্রকাশ করেছেন। উল্টো তারা সাবেক চেয়ারম্যান মি. সাইমন এ পেরেরার সাথে আতাত করে মামলা না করে অভিযুক্তকে দেশ ছেড়ে পালাতে সহযোগিতা করেন।

তিনি দেশ ত্যাগের পর মামলা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারির আরাম-আয়েশের জন্য জাপান থেকে পছন্দের মডেলের বিলাস বহুল গাড়ী আমদানী করা হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। বাজার মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত গাড়ীর মূল্য। অবৈধ ও অসচ্ছতার জন্য গাড়ী ক্রয়ের বিষয়টি বোর্ডে অনুমোদনই হয়নি। বোর্ড সভায় উক্ত গাড়ী ক্রয়ের বিষয়টি অনুমোদন না হওয়ায় চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত প্রদান করেন- “গাড়ী ক্রয়ের বিষয়ে ভবিষ্যতে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হলে চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে উক্ত দায় বহন করবেন। প্রতি মাসে এই গাড়ীর পিছনে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয় করে কাল্ব-কে আরো ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেক্রেটারি মালেক কাল্ব-কে তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা করছেন। তার নিজের ক্রেডিট ইউনিয়ন থেকে প্রতি মাসে ‘সম্প্রীতি’ নামক সরকারী ডিক্লারেশন ছাড়া অবৈধ মাসিক পত্রিকা বের করেন। প্রতি সংখ্যার পিছনের কভারে কাল্ব-এর বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে কাল্ব থেকে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

উক্ত বিজ্ঞাপন ছাপানোর জন্য কাল্ব বোর্ডের কোন অনুমোদন নেই। কাল্ব চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রোগ্রাম এ্যাডভাইজর নিয়োগ করে তাকে প্রতি মাসে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা সম্মানি দিয়ে তাদের দু’জনের নিজ ব্যক্তিগত ও দলীয় কাজে ব্যবহার করছেন। এেতে করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা সার্বিক কার্যক্রমে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি কাল্ব-কে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে বোর্ড সদস্যদের বাদ দিয়ে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তারা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই মতবিনিময় সভার নামে নিজ দলীয় নির্বাচনী সভা করে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে কাল্ব-এর ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি করেই চলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, জোনাস ঢাকী ও এমদাদ হোসেন মালেক এভাবেই ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে আজ প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক।

বেকার জোনাস ঢাকী কানাডা-তে বাড়ি কিনেছেন বলে জানা গেছে। যেখানে তার ২ মেয়ে বসবাস করেন। তিনিও নিয়মিত কানাডায় যাতায়াত করেন। আরেক বেকার সমবায়জীবি খ্যাত মালেক নামে বেনামে ফ্লাট-প্লট সহ প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক। কালব সদস্যরা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির অভিযুক্ত এই দুই কর্ণধার হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করে যেকেনো সময় বিদেশ পালিয়ে যাবার শঙ্কা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এখনই আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করা জরুরী।

আপনার মতামত লিখুন :