মোঃ রাহাত ইসলাম, সৃজনশীল সাংবাদিকঃ
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, অতিরিক্ত ভোগ, অবৈধ যানবাহনের তেল গ্রহণ এবং সংকটকালীন ভোগান্তি একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে “ফুয়েলপাস অ্যাপ” (Fuel Pass BD) একটি আধুনিক ও বাস্তবমুখী ডিজিটাল সমাধান, যা তেল বিতরণ ব্যবস্থাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সংকট মূলত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবেই তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা এবং ডলার সংকট, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–ইসরায়েল সংঘাত এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রণালি বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট, ফলে সরবরাহ ব্যাহত হয়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮০ ডলার থেকে ১০০ ডলারের বেশি হয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতি চাপে পড়ে। একই সঙ্গে ফ্রেইট চার্জ এবং বিমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তবে সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী দেশে সরাসরি জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই। মূল সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ মূল্য, সরবরাহ চেইনের চাপ এবং জনমনে সৃষ্ট প্যানিক বাইং।
বর্তমান জ্বালানি তেলের দাম (২০২৬)
২০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন মূল্য অনুযায়ী,
- ডিজেল: ১১৫ টাকা।
- অকটেন: ১৪০ টাকা।
- পেট্রোল: ১৩৫ টাকা।
- কেরোসিন: ১৩০ টাকা।
এই জ্বালানি তেলের মূল্য ঢাকা ও সারাদেশের সব ফুয়েল স্টেশনে কার্যকর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করেই এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফুয়েলপাস অ্যাপ এর মাধ্যমে যানবাহনের বৈধতা যাচাই সহজ হয়েছে। এতে অবৈধ যানবাহনের জ্বালানি গ্রহণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিন ও মাসিক ভিত্তিতে নির্ধারিত জ্বালানি বরাদ্দ জানা যাচ্ছে, যা অপচয় রোধে সহায়ক।
প্রতিটি রিফিল হিসাব, যেমন- ফিলিং স্টেশনের নাম, তেলের পরিমাণ, মূল্য, তারিখ ও সময় ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিউআর কোড প্রযুক্তি ব্যবহারে পুরো জ্বালানি গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়েছে।
সরকারের জন্য ফুয়েলপাস অ্যাপ একটি শক্তিশালী মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের দৈনিক মজুত, বিক্রি এবং কার্যক্রমের সময়সূচি রিয়েল টাইমে দেখা সম্ভব হচ্ছে। এতে জ্বালানি খাতে অনিয়ম কমছে এবং ভবিষ্যতের তেল আমদানি পরিকল্পনা আরও তথ্যভিত্তিক হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) পরিচালিত এই সেবা ঢাকা ও ঢাকা মেট্রো এলাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহে চালু রয়েছে।
ঢাকায় তেজগাঁও, মহাখালী, শাহবাগ, মিরপুর, গাবতলী, বিমানবন্দর, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, কামাল ট্রেডিং, সোনার বাংলা, গুলশান সার্ভিস স্টেশন এবং মেঘনা মডেল পাম্পে এই সেবা কার্যকর।
এছাড়া কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, যশোর, সিলেটসহ মোট ১৯টি জেলায় এই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ফুয়েলপাস অ্যাপ ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষ পাচ্ছে,
- নির্ধারিত জ্বালানি বরাদ্দ।
- বৈধ যানবাহনের অগ্রাধিকার ভিত্তিক সেবা।
- দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি হ্রাস।
- জ্বালানি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সমতা।
অ্যাপটির কার্যকারিতা আরও বাড়াতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফিচার সংযোজন প্রয়োজন,
- ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সংযুক্ত করা।
- ফিলিং মেশিনে পজ (পিওএস) / স্ক্যানিং প্রযুক্তি চালু করা।
- ডিজিটাল সিরিয়াল সিস্টেম চালু করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা।
এগুলো বাস্তবায়িত হলে ফুয়েলপাস সিস্টেম আরও কার্যকর ও আধুনিক হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ফুয়েলপাস অ্যাপ বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা খাতে এক সম্ভাবনাময় ডিজিটাল বিপ্লব। এটি একদিকে যেমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।