মো. ইউসুফ আলী
এআই(অও) প্রযুক্তির আবিস্কৃত এক বরপুত্র। যা নতুন প্রজন্মের হাতে হাতে বেড়ে ওঠা এক মহাশক্তি। বর্তমানে এর বহুল ব্যবহার আমাদের নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই। কিন্তু বর্তমানে এর অপব্যবহার যেভাবে বাড়ছে তাতেকরে দিশেহারা হয়ে পরার উপক্রম হয়েছে আমাদের মৌলিকত্বের ওপর।
এই প্রযুক্তির বহুল অপব্যবহারে হতাশা প্রকাশ করেছেন নতুন প্রজন্মের ঠিক আগের জেনারেশনটি। বর্তমানে এই এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে যে, আমাদের প্রজন্মের অনেকে ভাবতেই পারছেন না যে, এআই কি প্রযুক্তির আর্শিবাদ নাকি অভিশাপ! আসুন এর আগে আমরা জেনে নেই প্রযুক্তি মূলত কি ? আমরা জানি প্রকৃতি ও প্রযুক্তি এক নয়। প্রকৃতিই আসল আর প্রকৃতিকে গবেষনা করেই প্রযুক্তির আর্বিভাব। তবুও প্রযুক্তি আমদের জীবনমানকে সামনে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। তবে এই প্রযুক্তির যেমন ভালোর দিক রয়েছে তেমনি আবার এর বিপরিতে খারপ দিকও রয়েছে। আজ আমরা প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলবো। কথা বলবো প্রযুক্তির এপিঠ ওপিঠ নিয়ে। কথা বলবো এই সময়ের বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি এ আই নিয়ে। কিন্তু তার আগে আমরা জেনে নিতে চাই প্রযুক্তি ও প্রকৃতি নিয়ে। জেনে নিতে চাই এ আই কি সে সর্ম্পকে এবং তার ব্যবহার বিধি নিয়ে থাকছে আমাদের এ প্রতিবেদন। আমরা এও জানি যে, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, প্রযুক্তি হলো মানুষের তৈরি করা একটি ব্যবস্থা, যা প্রাকৃতিক নিয়ম ব্যবহার করে বা প্রাকৃতিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, প্রকৃতি হলো সেই সমস্ত কিছু যা প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান, যা মানুষ তৈরি করেনি। মানুষের তৈরি করা যা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান বা প্রাকৃতিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি। অর্থাৎ প্রকৃতি হলো মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। যেমন: গাছপালা, নদী, পাহাড়, আকাশ, বাতাস ইত্যাদি। যা প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান, যা মানুষ তৈরি করেনি। অথচ আমাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। সুতরাং প্রকৃতির অবদান যতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় প্রযুক্তি কিন্তু ততটা দীর্ঘমেয়াদী নয়। তাইতো যুগে যুগে মানুষ তাদের নিজেদের প্রয়োজনে নানা সময়ে নানা প্রযুক্তি আবিস্কার করেছেন। যেমন: কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, উড়ো জাহাজ,রকেট, গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদি। তবে প্রযুক্তির কাজ হল মানুষের জীবনকে সহজ করা, আরামদায়ক করা এবং চাহিদা পূরণ করা।
সংক্ষেপে, প্রযুক্তি হলো মানুষের তৈরি করা একটি সরঞ্জাম যা প্রকৃতির জ্ঞান ব্যবহার করে, আর প্রকৃতি হলো সেই জগৎ যা প্রযুক্তি সহ সবকিছু ধারণ করে। পৃথিবীর সৃষ্টি লগ্ন থেকে যার বহু নিদর্শনও আল্লাপাক টিকিয়ে রেখেছেন। যুগে যুগে মানুষ তাদের নিজেদের স্বার্থে যতসব প্রযুক্তিগত উন্নয়ণ করেছে তা সবই ছিল মানুষের কল্যাণে। অথচ মানুষ সব সময়েই প্রতিক্রিয়াটি ব্যবহার করে আসছে। এটম বোমা থেকে পারমানবিক ক্ষেপনাস্ত্র পর্যন্ত এর উদাহরনও রয়েছে ভুরি ভুরি। তাছাড়া অধুণা বিজ্ঞানেতো এরকম দৃষ্টান্তের কোন সীমা নাই। যার অপব্যবহারের প্রভাব আমাদের সমাজের প্রতিটা রন্দ্রে রন্দ্রে মিশেআছে। আজ এ ধরনের এক প্রযুক্তি নিয়েই কথা বলতে চাই। তা হলো এ আই।
তবে এর ব্যবহার প্রসঙ্গের আগেই আমরা জেনে নিতে চাই যে প্রযুক্তির বহুল ব্যবহৃত এই এআই আসলে কি? আমরা সকলে না জানলেও অনেকেই হয়ত জানি যে,এ আই শব্দটি যতটা ছোটো এর গভীরতা ততটা বেশি। আমরা যারা কোন না কোন ভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে জড়িত বিশেষ করে কম্পিটার-ল্যাপটপ কিংবা এনড্রয়েড মোবাইল তারা অনেকেই জানি যে,এআই হচ্ছে সর্বাধুনিক এবং বহুল ব্যবহৃত একটি এ্যাপস। আর এআই এর পূর্ণরূপ হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (অৎঃরভরপরধষ রহঃবষষরমবহপব) যার সংক্ষিপ্ত রূপ হলো এ আই (অও)। এআই এমন একটি মেশিন বা যন্ত্র বা কৌশল যার মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করে উন্নত থেকে উন্নত পরিসরে নেওয়া যায়, তাকে আর্টিফিশয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সংক্ষেপে এ আই (অও) বলে। কিন্তু আমরাতো এ কথা অনেকেই জানিনা যে,এআই কি ভালো নাকি খারাপ? তবে এ নিয়ে এ কথা সহজেই বলা যায় যে, এআই আজকের পৃথিবীতে নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে। এটি শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং একটি বিপ্লব। বিভিন্ন শিল্পে এআই উদ্ভাবন আনছে, যেমন সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং অন্যান্য খাতে। ভবিষ্যতে আরও বিস্ময়কর উদ্ভাবন ঘটবে, এমন আশাবাদী প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে। একই সাথে এধাই কেবল উন্নত বিশ্ব নয় বাংলাদেশেও এআই দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও ব্যবসার কাজে লাগছে।
২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭০% মানুষ নতুন কিছু শেখা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহার করতে চায়। তবে ৩৫% মানুষ মনে করে এআই তাদের জন্য ভালো হবে, আর ২৫% মনে করে এটি খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তাছাড়া প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এআই-এর একটি বড় ক্ষতির দিক হলো অনুকরণ। যেমন মানুষের কন্ঠ ও অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ করে হুবহু তার মতো কথা বলছে। কথার সঙ্গে মুখভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গিরও মিল থাকছে। যেমন ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনার কিছু ভিডিও ছাড়া হচ্ছে, যেগুলোর পুরোটাই অও-এর কারিশমা। এভাবে চলতে থাকলে কতো মানুষকে যে কতোভাবে ফাঁসানো হতে পারে বা লাঞ্ছিত করা হতে পারে তা ভেবে দেখার রয়েছে বৈকি! এই প্রক্রিয়া যে শুধু হাসি তামাশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, ব্লাকমেইল, তথ্যবিকৃতি ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হবে না তার গ্যারান্টি কে দিবে? অনেক মানুষ তো এগুলোকে বাস্তব মনে করে।
এর বাইরেও এআই এর অসাধারণ সব ধরনের চিত্র ভিডিও নিয়ে নানা ধরনের সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। কোনটা আসল কোনটা নকল আমরা সাধারণ মানুষরা পার্থক্য করতে পারছি না। সাইবার অপরাধীরা এআই ব্যবহার করে জালিয়াতি, যেমন ফিশিং ইমেইল বা ডিপফেক ভিডিও তৈরি করছে, যা আসল মনে হয় কিন্তু আসলে নকল। দিন শেষে এটি একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক মেশিন, যা সম্ভাবনার ওপর কাজ করে। বেশিরভাগ সময় এটি সঠিক হলেও, সবসময় নয়। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এআই মানুষের অলসতা বাড়াতে পারে। অনেকেই মনে করেন এআই সবসময় সঠিক কাজ করবে, কিন্তু তা সবসময় ভাবা ঠিক না। আমরা আবারও বলছি এআই-এর উপকারের অনেক দিক রয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব মারাত্মক ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনা করে এআই এর এই ক্ষতিকর দিকগুলো এ আই-এর প্রেগ্রাম থেকে অতি অবশ্যই বাদ দেওয়া উচিত।
আমরা জানি, প্রতিটি প্রযুক্তির ভালো ও খারাপ দুটি দিক রয়েছে।
এআইসহ অন্য কোনো প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সম্ভব বা বাস্তবসম্মত নয়। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে থামানো যাবে না, আর স্থানীয় ভাবে বন্ধ করাও কার্যকর সমাধান নয়। তবে এআই-এর কুফলগুলো বারবার আলোচনায় আনা জরুরি, যাতে মানুষ সচেতন হয়ে সেগুলো এড়াতে পারে। সুতরাং আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এর সঠিক ব্যবহার শেখানো ও দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করা, যাতে উপকার পাওয়া যায় এবং ক্ষতি এড়ানো যায়। পরিশেষে আমরা এ কথাই বলতে চাই যে,আমরা বিজ্ঞানের উন্নতি চাই। কিন্তু বিজ্ঞানের উন্নতির নামে আমাদের ক্ষতিসাধন করে কেউ ব্যবসা করে যাক আমরা আদৌ তা মেনে নিতে পারি না।
লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক