এক দশকে আটক ২৬ বাগডাশ, হত্যা ১১টি দ্রুত বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদক
কেউ বলে মেছোবাঘ, কেউ বলে বাঘরোল; কেউ বলে বাগডাশ। যে নামেই পরিচিতি থাকুক, পরিবেশের জন্য উপকারী এই প্রাণীটি এখন বিপন্নের পথে। গত এক দশকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ২৬টি বাগডাশ আটক হয়েছে। এর মধ্যে ১১টিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাকিগুলোর খবর কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলাজুড়ে বাগডাশের সংখ্যা কমে যাওয়ার নেপথ্যে খাদ্যাভাবের চেয়েও বেশি কাজ করছে পথদুর্ঘটনা কিংবা পিটিয়ে হত্যা। বন্যপ্রাণী হত্যার বিধান না থাকলেও নারায়ণগঞ্জে প্রায়ই বাগডাশ আটক কিংবা হত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাগডাশের প্রধান খাবার মাছ, কাঁকড়া ও সাপ। আর তাদের বেঁচে থাকার জন্য জল অত্যাবশ্যক। সেই জলভ‚মি না থাকলে প্রাণিটি খাবে কী? গবেষণা বলছে, নারায়ণগঞ্জ বাগডাশ টিকে থাকার জন্যও অযোগ্য একটি জায়গা। জেলার জলাভ‚মি অঞ্চল, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, বন্দর উপজেলায় প্রায়ই বাগডাশ দেখা যায়। সবশেষ গত ১৮ অক্টোবর ইছাখালীর জলসিঁড়ি এলাকায় বাগডাশ আটক করে এলাকাবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও ও বন্দরে মাঝে মাঝেই বাগডাশ দেখা যায় এবং এদের উদ্ধারের ঘটনাও ঘটে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। মেছোবাঘও বলা হয় এদের। তবে বাঘ নয় বরং মেছো বিড়াল নামটাই উপযোগী বলা যায়। এরা সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না, বরং মানুষ দেখলে পালিয়ে যায়। সম্প্রতি, এই প্রাণীটি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে, ফলে এর উপস্থিতি বেড়েছে।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জে বাগডাশের উপস্থিতি নিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কারণ প্রায়ই সেখানে বাগডাশ উদ্ধার হয়। ম‚লত বনভ‚মি ধ্বংস এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের কারণে ঘটছে বলে ধারণা করা হয়। পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের ফলে এসব বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে এবং এর ফলে সেখানে বাগডাশ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জ অঞ্চলের প‚র্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে বনভ‚মি ও গাছপালা কাটা এবং নদী-খাল ভরাটের মতো পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। এর ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক আবাস হারিয়ে ফেলছে। পরিবেশগত সংকটের কারণে মাঝে মধ্যেই এসব উপজেলা থেকে বাগডাশ উদ্ধার করা হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
পরিবেশ ধ্বংসের এই বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ে বাগডাশ উদ্ধারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২২ সালের জানুয়ারিতে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের মাঝিনা এলাকা থেকে একটি বাগডাশ উদ্ধার করা হয়, যা একটি বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দেইলপাড়া এলাকায় ঝোঁপের ভেতর একটি মৃত বাগডাশ পাওয়াা যায়। ২০২৩ সালে আড়াইহাজার উপজেলার নারান্দি এলাকা থেকে একটি বাগডাশ উদ্ধার করা হয়। সবশেষ ১৮ অক্টোবর ইছাখালিসংলগ্ন জলসিড়ি প্রকল্পের ভেতর থেকে একটি বাগডাশ উদ্ধার করে এলাকাবাসী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মোক্তার হোসেন বলেন, লোকজন বাগডাশটিকে আটক করে মাঝিনা পুকুরপাড় আলী আজগরের দোকানের সামনে নিয়ে আসে। সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় জমে। পরে প্রাণিটিকে লোহার খাঁচায় বন্দি করে স্থানীয় মাজিনা পুকুরপাড় এলাকার লজ্জা মিয়ার বাড়িতে রাখা হয়।
এদিকে, গত সোমবার সকালে রূপগঞ্জে ঝোঁপের ভেতর একটি মৃত বাগডাশ পাওয়া যায়। স্থানীয় মুন্না মিয়া জানান, সকালে ঝোঁপের ভেতর বাগডাশটি পড়ে থাকতে দেখে উৎসুক জনতার ভিড় জমে সেখানে। পরে স্থানীয় বাসিন্দা মুন্না মিয়া সেটিকে পিরুলিয়া-বড়ালু সড়কের পাশে রাখেন। তিনি বলেন, প্রায়ই এ সড়কে রাতে বাগডাশের আনাগোনা দেখা যায়। এ নিয়ে আমরা আতঙ্কে রয়েছি। পথচারী আলেয়া বেগম বলেন, কয়েক মাস আগেও দক্ষিণপাড়া এলাকা থেকে একটি জীবিত বাগডাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে এলাকাবাসী আতঙ্কে রয়েছে। কোথা থেকে আসে, কখন যে কার ক্ষতি করে ফেলে তার ঠিক নেই।
আড়াইহাজারের নারান্দি এলাকার ওদুদ মিয়া বলেন, এর আগে দুইটি বাগডাশ মেরেছিল স্থানীয়রা। প্রায়ই ঝোঁপঝাড়ে বাগডাশ দেখা যায়। দেইলপাড়া এলাকার মোতালিব মিয়া বলেন, এ সড়কে রাতের অন্ধকারে বাগডাশের আনাগোনা দেখা যায়। এ নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রিগ্যান মোল্লা বলেন, শুনেছি বাগডাশটি মেছো প্রজাতির। আশপাশে ঝোঁপঝাড় থাকায় এখানে মেছোবাঘের আনাগোনা রয়েছে। এর আগেও একটি জীবিত মেছোবাঘ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে আমরা চিরিয়াখানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তখনই স্থানীয়রা আমাকে জানিয়েছিল, এখানে গভীর রাতে আরো মেছোবাঘ চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে তারা কারো ক্ষতি করে না। রাতের অন্ধকারে খাবার খেতে বের হয়। এরা পরিবেশের জন্য উপকারী।
উপজেলা বন কর্মকর্ত সঞ্জয় হাওলাদার বলেন, রূপগঞ্জের প‚র্বাচলে মেছোবাঘারে উপস্থিতি বেশি। এরা ক্ষতির কারণ নেই। বরং পরিবেশের জন্য খুবই উপকারী। তবে বন কেটে ফেলায় তারা আবাস হারাচ্ছে। ফলে বের হয়ে আসছে বাইরে।
রূপগঞ্জ থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুনেছি গত ১৮ অক্টোবর একটি মেছোবাঘ আটক করে এলাকাবাসী। পরে কী করেছে জানা যায়নি। এর আগেও দক্ষিণপাড়া থেকে একটি জীবিত মেছোবাঘ উদ্ধার করা হয়েছিল। কোথা থেকে এ এলাকায় প্রায়ই মেছোবাঘ আসে, অথবা কেউ এনে ফেলে রেখে যায় কি-না, এ ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ