পদ্মা সেতুর প্রকল্প রক্ষা বাধে আকস্মিক ভাঙন, পাউবোর অবহেলার অভিযোগ

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

মোঃ সুমন তালুকদার ,শরীয়তপুর

পদ্মা সেতুর প্রকল্প এলাকার মূল বাধে নতুন করে আকস্মিক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে শরীয়তপুরের জাজিরা (দক্ষিন)  প্রান্তের নাওডোবা ইউপির জিরো পয়েন্ট এর মাঝি কান্দি এলাকার পদ্মা সেতু রক্ষার মূল বাঁধ। সোমবার দুপুরে  এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়। আকস্মিক ভাঙ্গনে দুপুরে এলাকার ছাত্তার মাদবরকান্দির ২০০ মিটারের মতো অংশ নদীতে ধসে পড়ে। ভাঙনে সুজন ফকির, জাহাঙীর ফকির, রব শেখ, জিয়াউর রহমান ফকিরসহ ১৫ জনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং  স্বপন মাদবর, রাজা মাদবর, আবুল বাসার মাদবর, খলিল মাদবর ও দেলা মাদবরসহ ৮ জনের বাড়ি ঘর বিলীন হয়ে যায়। এরা কেউ তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে পারেনি। অন্য অন্যদিকে ভাঙন আতঙ্কে অন্তত ত্রিশটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর স্থানীয়রা সরিয়ে নিয়েছে।

এর আগে গত বছরের নভেম্বর এবং জুন মাসে ২ দফায় ৩০০ মিটার ভেঙে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলায় ও দ্রুত বাধ মেরামত পদক্ষেপ না নেওয়াও বর্তমান ভাঙ্গনের শিকার এলাকাবাসী।

পাউবো, জাজিরা উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,  এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে, এলাকায় পদ্মাসেতু রক্ষাবাঁধের প্রায় ১০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়। তখন শরীয়তপুর পাউবো তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত কাজ শুরু করতে পারেনি। সময় ক্ষেপণ করে চার মাস পর, চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল থেকে প্রায় ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বালুভর্তি জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে মেরামত কাজ শুরু করে। ওই সময় বাধ মেরামত প্রকল্প পরিদর্শন করতে আসলে, ভাঙনের বিষয়টি জানার পরেও দ্রুত কাজ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে, তখন এ বিষয়ে কোনো উত্তর দিতে পারেননি শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী

এর পর এই বছরের ৭ জুন পুনারায় উজান এবং ভাটি মিলিয়ে আনুমানিক ২০০ মিটার বাঁধ ভেঙে যায়। (গতই জুন ৮ই জুন এই বিষয়ে দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনে “পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা রক্ষা বাঁধে আবারও ভাঙন” প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।) এই ভাঙ্গনের কারনে ৩ জনের বসতবাড়ি ও ২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া হয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় ভাঙনের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তারেক হাসান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাবেরী রায় এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তারেক হাসান জানান, “প্রায় ১২-১৩ বছর আগে সেতু বিভাগ পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা রক্ষার জন্য এই বাঁধ নির্মাণ করেছিল। বর্তমানে জাজিরার নাওডোবা জিরোপয়েন্ট এলাকায় ১০০ মিটার অংশ ভেঙে পড়ায় পাউবো ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) যৌথভাবে সমীক্ষা চালায়। তাতে দেখা গেছে, প্রায় ১ কিলোমিটার অংশে বাঁধের নিকটে নদীর গভীরতা বেড়েছে এবং তলদেশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। বাকি ১ কিলোমিটার অংশেও নদী বাঁধের কাছাকাছি চলে এসেছে এবং মাটির ক্ষয় অব্যাহত রয়েছে। ফলে পুরো বাঁধ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।”

তিনি আরও জানান, সোমবার উজান এবং ভাটি মিলিয়ে আনুমানিক ২০০ মিটার বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। এই মুহূর্তে ভাঙ্গন কমাতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। জিও ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়েছে। রাতের মধ্যেই সেগুলো ডাম্পিং করা হবে। বাঁধ মজবুতকরণের জন্য একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আর আগামী বর্ষার আগে পুরোপুরি ভাবে বাধ মেরামতের কাজ সম্ভব হবে না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ গত নভেম্বরে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে পাউবো শরিয়তপুর সঠিক সময়ে, বাত মেরামত শুরু করতে পারেনি যার জন্য এখন ভাঙ্গন শুরু হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারেক বলেন, (বর্তমানে ভেঙে যাওয়া অংশ পূড়বে ভেঙে যে বাঁধের সাথে হলেও) বর্তমান ভেঙে যাওয়া অংশের সাথে পূর্বে ভেঙে যাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। পূর্বের ভেঙ্গে যাওয়া মেরামতকৃত অংশ অক্ষত রয়েছে। মূলত পাশাপাশি জায়গায় নতুন করে ভেঙেছে। কারন আমরা দ্রুত সময়ের বাধ মেরামতের যে ধরনের কাজ করেছি তাতে আমরা প্রশংসার দাবিদার। তাছাড়া এই প্রকল্প এলাকার বাধ নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কাবেরি রায় বলেন, আজকের ভাঙ্গনে ৮ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ও ১৫ টি বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। উৎসুক জনতার কারণে ভুক্তভোগীরা তাদের বাড়িঘর সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। আমরা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছি, আজ রাতেই তারা  আমাদেরকে সহযোগিতা করবে। আর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে।

ভাঙ্গনের শিকার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মালিক, সুজন ফকির বলেন, বাড়িতে দুপুরে খাবার খেতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ করে শোর চিৎকার শুনি, পদ্মা সব ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। এসে দেখি নদীর ভেতরে আমার দোকানটি পড়ে আছে। সর্বস্বান্ত হয়ে গেলাম। সর্বনাশা নদী প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার সময় ও দিল না। এখন পরিবার নিয়ে কিভাবে চলব বুঝতে পারছি না।

বাড়িঘর হারানো খলিল মাদবর বলেন, হঠাৎ করে পানিতে কিছু একটা ভেঙে পড়া শব্দ পাই। গিয়ে দেখি কয়েকটি দোকান ভেঙে নদীতে চলে গেছে। এরপরে ঘরের আসবাব পত্র সব সরিয়ে ফেলি। তার আধা ঘন্টার মধ্যেই পদ্মা আমার বাড়ি কেড়ে নিল। নিঃস্ব হয়ে গেলাম। মাথা গোজার ঠাই থাকলো না। গত বছর যখন এখানকার বাঁধ ভেঙ্গে গেল তখন যদি, সাথে সাথে বাধটি মেরামত করা হতো, তাহলে হয়তো আজকে আমাদের এই দুর্দিন দেখতে হতো না।

উল্লেখ্য, পদ্মা সেতুর এলাকায় বালুচর গড়ে ওঠা এবং বাঁধের নিকটবর্তী স্থানে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন শুরু হয়েছে। বর্ষায় পানি বাড়ার সাথে সাথে ভাঙনের তীব্রতাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া, ভাঙনের আশেপাশের অন্যান্য স্থানও ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায়, পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে পাউবো। মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প অনুমোদন পেলেই এই বর্ষার শেষ হলে শুষ্ক মৌসুমে মূলবাধ রক্ষা কাজ শুরু হবে।

বাঁধটি মজবুত করা না হলে, পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকা সার্ভিস এরিয়া-২, সেনানিবাস, পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাওডোবা-পালেরচর সড়ক, মঙ্গল মাঝি ও সাত্তার মাদবর বাজারসহ চারটি গ্রামের কয়েকশো পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে।

এ অবস্থায়, পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে পাউবো। মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প অনুমোদন পেলেই এই বর্ষার শেষ হলে শুষ্ক মৌসুমে মূলবাধ রক্ষা কাজ শুরু হবে।

এদিকে নদীভাঙনের কারণে বাঁধের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকশো বসতবাড়ি এখন ভাঙনের হুমকিতে।

 

 

 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ