রবিউল ইসলাম:
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) বরিশাল বিভাগের মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহা এক সময়ের সাধারণ পরিবারের সন্তান, যার বাবা ছিলেন পত্রিকার হকার। কিন্তু মাত্র ১১ বছরের চাকরি জীবনে তিনি অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে উঠেছেন। এই অভিযোগের সাথে জড়িয়ে আছে অবৈধ যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, ঘুষবাণিজ্য, বাসে অগ্নিকান্ডের ঘটনা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযান। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, তার পরিবারের আওয়ামী লীগের সাথে গভীর যুক্ততা, যা তার কর্মজীবনের দ্রুত উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। সা¤প্রতিক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে, যা বিআরটিএর স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছে।
সৌরভ কুমার সাহার জীবনযাত্রা যেন একটি রূপকথার গল্পের মতো। ২০১৪ সালে বিআরটিএতে মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নোয়াখালী অফিসে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। তার পারিবারিক পটভূমি ছিল অত্যন্ত সাধারণ-বাবা বিজয় কৃষ্ণ সাহা পত্রিকা বিক্রি করে সংসার চালাতেন, পরিবার টানাপোড়নের মধ্যে দিন কাটাত। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এবং শেখ হাসিনার বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সুপারিশে চাকরি পাওয়ার পর থেকে তার জীবন বদলে যায়। দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে তিনি ঢাকা উত্তরা, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, মাদারীপুর এবং অবশেষে ২০২৩ সালে বরিশালে মোটরযান পরিদর্শক হন। এই ১১ বছরে তিনি নামে-বেনামে (বাবা, শ্বশুর, শ্যালক এবং দালালদের নামে) অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্পদের তালিকা চোখ কপালে তুলে দেয়। তার মালিকানায় রয়েছে ১০টি বাস, যা হাওলাদার পরিবহন, আশিক পরিবহন এবং ফরিদপুর বাস মালিক সমিতির অধীনে চলে। এগুলো ঢাকা, বরিশাল-ফরিদপুর-ভাঙ্গা-খুলনা-গোপালগঞ্জ রুটে যাতায়াত করে। এছাড়া ৪টি প্রাইভেট কার (কিছু কিস্তিতে কেনা, কিছু দালাল রিয়াজ খানের নামে রেজিস্ট্রেড), অর্ধ কোটি টাকার বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি, ফরিদপুরে কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশা (ভগ্নিপতির তত্ত¡াবধানে)। অন্যান্য সম্পদের মধ্যে মাদারীপুরের টেকেরহাট থেকে হাওলাদার পরিবহনের রুট কেনা, বরিশালের নথুল্লাবাদে বাস কাউন্টার এবং নতুনবাজারে ২৭ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ার আধুনিক ভবন। জমি এবং অন্যান্য বিনিয়োগও রয়েছে। তার মাসিক বেতন মাত্র ২৬-২৭ হাজার টাকা, কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং রেজিস্ট্রেশন থেকে ঘুষবাণিজ্য করে মাসে ৩০-৩৫ লাখ টাকা উপার্জন করেন। প্রতি লাইসেন্সে ২.৫ হাজার টাকা, সিএনজি ফাইলপ্রতি ৪০-৫০ হাজার টাকা, ট্রাকপ্রতি ৫-১০ হাজার টাকা-এসব দালালদের (রিয়াজ খান, আলাউদ্দীন, জাকির) মাধ্যমে চলে। গত বছর ১৯১টি সিএনজি রেজিস্ট্রেশন অনুমোদনের আগেই (প্রতিটিতে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ) এবং ২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে সৌরভ এসব অস্বীকার করে বলেছেন, তার বাবার নামে শুধু একটি বাস এবং রেন্ট-এ-কার ব্যবসা রয়েছে।
এই দুর্নীতির আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে বরিশাল বিআরটিএ অফিসে আমদানি ছাড়াই ২০০টির বেশি থ্রি-হুইলার (বাজাজ বিআর এলপিজি মডেল) রেজিস্ট্রেশনের ঘটনায়। এগুলোর নম্বর বরিশাল মেট্রো-থ-১১-১৯৩০ থেকে ১১-২১৪৬। জাল কাগজপত্র (ভুয়া এলসি নম্বর, চালানপত্র, বিল অফ এন্ট্রি) ব্যবহার করে এই অবৈধ কাজ করা হয়েছে, যার ফলে সরকার কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছ। বিআরটিএ সদর দপ্তরের অনুমোদন (১৪ আগস্ট ২০২৩) পাওয়ার আগেই রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়, যা আইনত অসম্ভব। সৌরভ এই সময় দায়িত্ব ছিলেন এবং তথ্য চাইলে সদুত্তর দেননি। অন্যান্য জড়িতরা হলেন সাবেক সহকারী পরিচালক মো. রুকনুজ্জামান (যিনি একদিনে ১৮৭টি রেজিস্ট্রেশন দিয়েছেন), মোটরযান পরিদর্শক দেবাশীষ বিশ্বাস, বিভাগীয় পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান (যিনি পার্টস আকারে আমদানির দাবি করেছেন কিন্তু জাল কাগজপত্রের দায় কোম্পানির উপর চাপিয়েছেন এবং সাংবাদিককে অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছেন)। এছাড়া সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ ম্যানেজ করেছেন এবং রানা অটোমোবাইলস কোম্পানী জাল কাগজপত্র সরবরাহ করেছে। কাস্টম হাউস থেকে নিশ্চিত যে এলসি নম্বরগুলোতে শুধু পার্টস আমদানি হয়েছে, সম্পূর্ণ গাড়ি নয়। এই গাড়িগুলো অবৈধ পথে দেশে আনা হয়েছে, যার ফলে মালিকরা হয়রানির শিকার হতে পারেন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
সৌরভের কর্মক্ষেত্রে অন্যান্য ঘটনাও তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বরিশাল রুটের বিলাসবহুল বাসে (যেমন হানিফ পরিবহন) অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তিনি মন্তব্য করেছেন যে, এগুলো ওভারহিটের কারণে ঘটেছে। যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে বলেছেন, “আর কোনোদিন এসি বাসে উঠব না।” এছাড়া, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন মাসে অতিরিক্ত ভাড়া এবং ফিটনেসবিহীন বাস চলাচল বন্ধে অভিযানে তিনি অংশ নিয়েছেন, যেখানে তিনটি পরিবহনকে জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু এসব অভিযান কি শুধুমাত্র দেখানোর জন্য? অনেকে মনে করেন, এগুলো তার দুর্নীতির আড়াল করার প্রয়াস মাত্র।
এসব অভিযোগের পিছনে লুকিয়ে আছে সৌরভের পরিবারের রাজনৈতিক যুক্ততা। তার মা কৃষ্ণা রানী সাহা ফরিদপুর পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সৌরভ বিপুল অর্থ খরচ করে তার মনোনয়ন নিশ্চিত করেছিলেন। পরিবারটি ‘আওয়ামী পরিবার’ হিসেবে পরিচিত-বাবা ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের আর্থিক সহায়তা করেন। সৌরভ নিজে সক্রিয় সদস্য না হলেও, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে তার আর্থিক লেনদেন চলত। মাদারীপুরে তার কর্মজীবন (২০২০-২০২৩) যুক্ত হলেও, সেখানে সরাসরি দলীয় পদাধিকারী ভূমিকা নেই। তবে তার ব্যবসায়িক সম্পদ (হাওলাদার পরিবহনের রুট) মাদারীপুর-কেন্দ্রিক, যা রাজনৈতিক প্রভাবের ফল বলে মনে করা হয়। এই যুক্ততা তার চাকরি এবং সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
সৌরভ কুমার সাহার ঘটনা বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির একটি উদাহরণ। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি, জনগণের ভোগান্তি এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠেছে। দুদকের তদন্ত চলছে, কিন্তু কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এমন ঘটনা বাড়তে পারে। সৌরভের মতো কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জনগণ আশা করছে, এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য উন্মোচিত হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।