মোঃ রফিকুল ইসলাম খান(পাইকগাছা)ঃ
খুলনায় সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় পাইকগাছার কপিলমুনিতে। এখানে রাজাকারদের বৃহৎ ঘাঁটি ছিল। ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ হিসেবে যুদ্ধকালীন সময়ে পরিচিতি পাওয়া এই ঘাঁটি ছিল অনেক সুরক্ষিত। শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। দুই দফা আক্রমণের চেষ্টা করেও পিছু হঠতে হয়েছে। পরে নৌ ও স্থল পথে চতুর্মুখী আক্রমণে শত্রুরা পর্যুদস্তু হয়। ৬ ডিসেম্বর ভোর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৬২ ঘণ্টা যুদ্ধের পর দুর্ভেদ্য এই ঘাঁটির দখল নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। ২-৩টি শিশুসহ দেড় শতাধিক রাজাকার-আলবদরকে বন্দী করা হয়। ৯ ডিসম্বের কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির স্কুল মাঠে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে গণআদালতে বিচারের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী কুখ্যাত রাজাকারদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। বয়স বিবেচনায় শিশুদের মুক্তি দেয়া হয়। এই যুদ্ধে দুই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
মুজিব বাহিনীর খুলনা অঞ্চল প্রধান কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধরা ট্রেনিং শেষে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢোকার পর তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে প্রথমে তালা ও পরে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের বিভিন্ন অঞ্চলের থানা এলাকায় পর্যায়ক্রমে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি স্থাপন করেন। তালা থানার বালিয়াদাহ, বাওখোলা, পাটকেলঘাটা, ইসলামকাঠী, বুদহাটা, কেয়ারগাতি, পাইকগাছা থানা সদর, বড়দল, বটিয়াঘাটা, বারোআড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সফল যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। এসব এলাকা মুক্ত হওয়ার পর বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ বলে সে সময়ে পরিচিতি পাওয়া কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্প। বিনোদ বিহারী সাধুর (প্রয়াত) সুরক্ষিত দ্বিতল ভবন দখল করে রাজাকার বাহিনী এ অঞ্চলের বৃহৎ ক্যাম্প স্থাপন করে। কপিলমুনি বাজার এলাকায় অবস্থিত এই ক্যাম্পে দুই দফা আক্রমণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ওই ভবনটির মূল দেয়াল ছিল ২০ ইঞ্চি গাঁথুনির। ভবনের সীমানা প্রাচীর ছিল ১৫ ইঞ্চি পুরু। এর পরও বড় বড় সুন্দরী কাঠ দিয়ে ঘাঁটির নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়েছিল রাজাকাররা। বিল্ডিংয়ের ছাদে চার কোণে চারটি বাঙ্কার তৈরি করেছিল। যেখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত গোলাগুলি করতে পারত। মূল ঘাঁটি পাহারা দেয়ার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব-উত্তর দিকে দুইটি ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। ভবনটি এত মজবুত এবং ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এত শক্তিশালী ছিল যাতে বাধা অতিক্রম করে আক্রমণ করা খুব কঠিন ছিল।এরপর স্থল ও নৌ-পথে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী মুক্তিযুদ্ধাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ভোরে কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ চালানো হয়। এই আক্রমণের মূল পরিকল্পনায় ছিলেন মুজিব বাহিনী ডেপুটি প্রধান শেখ ইউনুস আলী ইনু, নেভাল প্রধান গাজী রহমতউল্লাহ দাদু, মুজিব বাহিনী সহকারী প্রধান স.ম বাবর আলী, লে. শামসুল আরেফিন প্রমুখ। পরিকল্পনা অনুযায়ী মূল ঘাঁটির পশ্চিম পাশে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধের পাশে অবস্থান নিয়ে মুজিব বাহিনীর অন্যতম কমান্ডার তৌফিক আহমেদ ভোর ৫টা ১ মিনিটে আরসিএল গান থেকে গুলিবর্ষণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে নেভালের সদস্যরা ‘ডেমুলেশন’ দিয়ে সুন্দরী কাঠের প্রাচীরটি উড়িয়ে দেয়। শুরু হয় চারদিক থেকে আক্রমণ। কয়েক শ’ মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে অংশ নেন। ৬২ ঘণ্টা যুদ্ধের পর ৯ ডিসেম্বর সকালে ২-৩ শিশুসহ ১৫৬ রাজাকার-আলবদরকে গ্রেফতার করা হয়। এই যুদ্ধ শুরুর আগে পাকসেনারা যাতে ওদের সহযোগিতা করতে না পারে সেজন্য রাস্তার কালভার্ট উড়িয়ে দেয়ার জন্য ট্রেন্স খুঁড়ে স.ম আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে কানাইদিয়ায় এবং কপোতাক্ষের পূর্বপাড়ে একইভাবে ইঞ্জিনিয়ার মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে আর একটি দল অবস্থান গ্রহণ করেন। কিন্তু পাকসেনারা না আসায় কালভার্ট অক্ষত থাকে। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার ও শাহাবুদ্দিন শহীদ হন। বেশ কয়েকজন রাজাকারও মারা যায়। ওই ক্যাম্প থেকে আটককৃত শিশুদের বয়স বিবেচনায় ছেড়ে দেয়া হয়। বাকিদের ২০ সহস্রাধিক নির্যাতিত মানুষের উপস্থিতিতে গণআদালতে বিচারের মাধ্যমে তাদের গুলি করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা ফারুক সরদার আক্ষেপ করে বলেন, অনেকে এখন বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেন না। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি, মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি তারাও মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনায়। তারপরও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বেঁচে থাকতে চান।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ