আমাদের কন্ঠ ডেস্ক:
রংপুরের পীরগাছাসহ কয়েকটি এলাকায় হঠাৎ করেই বিরল একটি রোগের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে এ রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হাসপাতালে ভিড় করছেন। একই উপসর্গ নিয়ে অনেক গবাদি পশু মারা যাওয়ায় ‘অ্যানথ্রাক্স’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার খামারিদের মাঝে।
পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স‚ত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই ১০ থেকে ১২ জন রোগী এই বিরল রোগের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসছেন। অনেক সময় একই পরিবারের সব সদস্যও আক্রান্ত হচ্ছেন। এখনো পরীক্ষাগারে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় না হলেও অ্যানথ্রাক্স রোগের উপসর্গের সঙ্গে এ সংক্রমণের মিল পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুরের পীরগাছার সদর, তাম্বুলপুর, ছাওলা, পারুল, ইটাকুমারী ইউনিয়নের প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্রামের গবাদি পশু ও মানুষের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সদর, ছাওলা ও তাম্বুলপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম। পীরগাছার বাসিন্দা জহরা বেগম জানান, গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গরু ও ছাগল লালনপালন করেন তিনি। হঠাৎ তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার দুটি গরু মারা যায়। এর মাত্র তিন দিনের মধ্যে আরো একটি গরু ও তিনটি ছাগল মারা যায়।
সেই গবাদি পশুর সেবাযতœ নিতে গিয়ে হঠাৎ দেখতে পান তার হাতে ফুসকুড়ির মতো কিছু একটা উঠেছে। দুই দিনের মধ্যেই সেই ফুসকুড়ি বড় ঘায়ে পরিণত হয়েছে। এখন সেখানে প্রচÐ যন্ত্রণা করে, চুলকায়। এ নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত। উপজেলায় গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি।
একই সমস্যায় ভুগছেন পীরগাছার মমেনা বেগম নামের আরেক নারী। তিনি জানান, দেড় সপ্তাহ আগে হঠাৎ করেই এক এক করে সবগুলো গরু তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়। স্থানীয় পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পশুগুলোকে সুস্থ করে তুলতে সব ধরনের চেষ্টা করেছি। অসুস্থ গরুর চিকিৎসা করাতে গিয়ে এই বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে গবাদি পশুর খামারিরা আশঙ্কা করছেন অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বলছেন— সময়মতো ভ্যাকসিন না আসায় এবং রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, গ্রামের অনেকেই গরু-ছাগল পালন করেন। যদি অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়ব। তাই দ্রæত সব পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যানথ্রাক্স গরু, ছাগল, মহিষ— এই ধরনের প্রাণীর মধ্যে প্রথম দেখা যায় এবং আক্রান্ত পশু থেকে মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়তে পারে। ম‚লত দুই ধরনের অ্যানথ্রাক্স হলেও বাংলাদেশে যে অ্যানথ্রাক্স দেখা যায়, তা শরীরের বাইরের অংশে সংক্রমণ ঘটায়। এ ধরনের অ্যানথ্রাক্সে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোঁঙা বা গোটা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার আঁখি সরকার জানান, প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী আসছেন। আক্রান্তদের কারো হাতে, গায়ে ক্ষতচিহ্ন দেখা দিচ্ছে। উপসর্গ দেখে মনে হচ্ছে, এটি অ্যানথ্রাক্স হতে পারে। এ অবস্থায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. একরামুল হক মÐল বলেন, পীরগাছায় এ সমস্যাটি বেশি দেখা দিয়েছে; আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছি। গত চার মাস ধরে ভ্যাকসিন ছিল না। যার কারণে গরু-ছাগলকে ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হয়নি। গত মঙ্গলবার ভ্যাকসিন এসেছে এবং তা প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, এই রোগের বিষয়টি অবহিত হয়েছি। ইতিমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, যথাযথ চিকিৎসা নিলেই সুস্থ হওয়া সম্ভব রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আক্রান্ত পশু কখনো জবাই করে মাংস খাওয়া যাবে না। আক্রান্ত পশুর সেবা করার সময় অবশ্যই গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। পরে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত-পা ধুয়ে ফেলতে হবে। তবে রোগটি অ্যানথ্রাক্স কি না সেটা নিশ্চিত করে জানাননি তিনি।