মো.ইউসুফ আলী
চলতিমাস আমাদের জুলাই বিপ্লবের মাস। যে মাসকে ঘিরে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা কর্মসূচী। রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তী উদযাপন ও জুলাই সনদেরমত গুরুত্বপূর্ণ সব কর্মসূচী। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে ঘটে গেল এক লোমহর্ষক হত্যাকান্ড। যা নিয়ে দেশ হয়ে উঠেছিল উত্তাল। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার গোপালগঞ্জে ঘটে গেল বড়ধরনের আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা। ফলে গোপালগঞ্জ আজ পরিনত হয়েছে টক অব দ্যা কান্ট্রিতে। দেশের সকল শ্রেণীর মিডিয় জগৎ থেকে শুরু করে হাট-বাজার কিংবা চায়ের দোকানেও আজ আলোচনায় গোপালগঞ্জ।
বুধবার গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির এনসিপির সমাবেশকে ঘিরে যে সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে তা আজ সারাদেশে আলোচিত ঘটনায় পরিনত হয়েছে। যে কারনে দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের চোখ আজ গোপালগঞ্জের দিকে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানাযায়,এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে ঘিরে বুধবার দিনভর সেখানে দফায় দফায় হামলা,ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এ হামলা চালিয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। হামলাকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে ৪ জন নিহত এবং অন্তত ৯ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হবার খবর জানাগেছে। এ ঘটনার পর সেখানে জারি করা হয়েছে কারফিউ । ফলে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ বুধবার আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় রাত পার করলেও বৃহস্পতিবারের পরিবেশে সেখানে আরো থমথমে ভাব বিরাজ করছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।তবে এ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি পুরো জাতিকে উৎকণ্ঠিত করেছে।
অপরদিকে এ ঘটনার তীব্র ন্দিা জানিয়ে এ নিয়ে সরকারের কড়া সমালোচনাও করেছে বিএনপি-জামায়েতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। আবার এ নিয়ে ঘুরে দাড়িয়েছে দেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগন। তবে এ ঘটনা আমাদের রাজণীতিতে বিভিন্ন ধরনের প্রভাবও ফেলতে পারে। এর মাধ্যমে নির্বাচন প্রলম্বিত করার ভুমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।
অপরদিকে এঘটনাকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাড়ানোর একটি দু:সাহস বলেও মনে করছেন অনেকে। এটা দেখে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বা অন্যান্য এলাকায় তাদের উজ্জীবিত হওয়ার চেষ্টা থাকবে। এরই বহি:প্রকাশ দেখা গেল গোপালগঞ্জের এলাকায়। অথবা এর মাধ্যমে তারা তাদের শক্তিরও একটা জানান দিল বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। আওয়ামীলগ তার একটা শক্তির মহরা দিল এবং এনসিপিই তা করতে সাহস যোগাতে সহযোগিতা করেছেন বলেও মত প্রকাশ করেছে অনেকে। ফলে এ ঘটনায় এনসিপি যেভাবে আলোচিত হয়েছেন তার চেয়ে সমালোচিতও হয়েছেন অনেক বেশী। সেখানে যাওয়াটা যে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল সে বিষয়নিয়েই এ সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। তবে আমাদের কঠিন বিপদে আমাদের সেনাবানিী যে কঠোর ভুমিকা পালন করে আসছে তার বহি:প্রকাশ আবারো তারা দেখালো বুধবারের ঘটনায়। তা নাহলে এদিন আরো বড় কিছু ঘটে যেতে পারতো গোপালগঞ্জে এমন দাবি বিশ্লেষকদের। এর আগেও আমাদের সেনাবাহিনীর এমন ভূমিকার উদাহরণ অনেক। গত বছর ২৫ আগস্ট সচিবালয়ে হাসনাত আবদুল্লাহসহ ৫০ জন শিক্ষার্থী আন্দোলনরত আনসার সদস্যদের হামলার শিকার হন। সে সময়ও সেনাবাহিনী তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যায়।
এছাড়া ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা যখন বুক পেতে দিয়েছিল তখন সেনাবাহিনীই ছিল একমাত্র ভরসা। বুধবার গোপালগঞ্জে যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটল তাতে আবারও প্রমাণ হলো সংকটে সেনাবাহিনীই ভরসা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও আখতার হোসেন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে (এপিসি) করে গোপালগঞ্জ ছাড়েন। প্রথমে তাঁরা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকে সেনাবাহিনী তাদের উদ্ধার করে নিরাপদে গোপালগঞ্জ ছাড়ার ব্যবস্থা করেন। তার আগে সেখানে এনসিপির সমাবেশে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালালে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতির মঞ্চ উত্তপ্ত হবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কুচক্রীরা নিজেদের ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কিন্তু বারবার বলা হচ্ছে, এই হিংস্র উন্মাদনার পেছনে যারাই থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নচেৎ,এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার পরিবেশকে বিপন্ন করবে।
সুশাসন নিশ্চিতে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রয়োজনে সর্বাত্মকভাবে সরকারের পাশে থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করতে আমরা দেখছি, যা অবশ্যই ইতিবাচক।আমরা মনে করি, অপশক্তির হিংস্রতার লাগাম টানতে না পারলে ’২৪-এর অর্জন ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়বে। একটি বৈষম্যহীন, সুশাসিত গণতান্ত্রিক দেশের যে স্বপ্ন সবাই হৃদয়ে লালন করছেন, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমাদের রাজণীতির ঈশান কোণে ষড়যন্ত্রের যে মেঘ জমেছে, তা যেন আকাশকে ঢেকে ফেলতে না পারে, সেজন্য সব পক্ষকে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে কেউ যাতে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে না পারে, সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। চলমান চিরুনি অভিযান সঠিকভাবে পরিচালিত হোক এবং প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ুক, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।