মো.ইউসুফ আলী-
বাংলাদেশের রাজণীতিতে এখন ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে জামায়েত-বিএনপি।’২৪এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকেই এ দুটি দল নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে চলছে নানামূখী আলোচনা। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সর্বত্র আলোচনার বিষয় এখন ওই একটাই। কারন ’২৪এর গণ- অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গত এক বছরে তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও অন্যসব কর্মকান্ডও মানুষ দেখেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। দেশবাসীর এই ভিন্ন দর্শনের একটি বহি:প্রকাশও ঘটেছে মিনি পার্লামেন্ট খ্যাত ডাকসু নির্বাচনে। এরপর আবার জাকসুতেও সেই একই রূপ। দেশের শিক্ষাঙ্গনের এ দুটি নির্বাচন এখন আলোচনার ঝড় তুলছে চায়ের দোকানেও। এ নির্বাচনী উপলব্দি থেকে এখনই হিসেব চলে আসছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। তাইতো দেশের সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিনত হয়েছে জামায়েত-বিএনপি। এ আলোচনা এখন শুধু দুটি রাজনৈতিক দলের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এ আলোচনা এখন পৌছে গেছে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে। এ আলোচনা চলে জনে জনে। চলে নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে হাট-ঘাটে,মাঠে-ময়দানে, চায়ের দোকানে, অবসরে-আড্ডায় কিংবা রাজণীতির উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। অর্থাৎ দেশজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনায় এখন কেবল জামায়েত-বিএনপিই ব্যাপকভাবে আলোচিত।
আমরা জানি বাংলাদেশের রাজণীতির মাঠে বিশাল বড় দুটি রাজনৈতিক দল হল- বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পালা বদলে এ দুটি রাজনৈতিক দল বেশ দীর্ঘ সময় ক্ষমতার চেয়ারে বসে দেশ শাসন করেছেন। এতেকরে সু-নাম কিংবা দুর্নাম দু’ধরনের খেতাবেই ব্যাপক আলাচিত-সমালোচিত হয়েছেন তারা। তবে ২০০৭ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২০০৮ থেকে ২০২৪ টানা সতের বছর আওয়ামী লীগের দেশ শাসন কিংবা দু:সাশাসন যেটাই বলি না কেন এ সময়ে রাজণীতির মাঠে দাড়াতে না পারলেও জনসমর্থনের দিক থেকে ভেতরে ভেতরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল বিএনপি। তৎকালিন আওয়ামী সরকারও সেটা আচ করতে পেরেছিলেন খুব ভালো ভাবেই। তাই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে একটিও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করেননি তৎকালিন আওয়ামী সরকার। যে কারনে আস্তে আস্তে জণরোষের শিকার হয় দলটি। যার ফল স্বরুপ সৃষ্টি হয় ’২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার টানা ৩৬ দিনের গণ আন্দোলনে ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে যায় টানা ১৭ বছরের ক্ষমতা আর দু:শাসনের আধিপত্য। ৫ আগষ্ট-২০২৪ গণভবনের পেছনের রাস্তা দিয়ে পালাতে বাধ্য ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে জণরোষের হাত থেকে ব্াঁচতে দেশে ও দেশের বাইরে দিগ-বিদ্বিগ পালাতে বাধ্য হয় আওয়ামী লীগের রাঘব বোয়াল থেকে চুনোপুটি পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও। পালাতে গিয়ে ধরাও পরে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় নেতা-নেত্রীও। মূহুর্তে দেশের ভেতর তৈরী হয় মবের রাজত্¦। তিন দিনের মাথায় ৮ আগষ্ট গঠিত হয ড.ইউনূসের নেতৃত্বাধিন অন্তর্বর্তী সরকার। দেশ তখনও অশান্ত ঠিক এই সময়ে দেশের সর্বত্র হাট-ঘাট মাঠ দখল আর বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে মেতে ওঠে বিএনপি ও তার অংঙ্গ সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। তাদের হাতে মবের শিকার হন পতিত সরকারের বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যায়িত করে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করা হয় তাদেরকে। যার বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রভাগে ছিল নগর-মহানগর ও জেলা-উপজেলা কিংবা মাঠ পর্যায়ের বিএনপি নেতা-কর্মীরা। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বিএনপির বাইরের নেতা-কর্মীরা। তাদের বে-আইনী তান্ডবে দেশে নেমে আসে ভয়ংকর এক অন্ধকার রূপ। কারো কারো মতে তখন দেশ ফিরে যায় প্রস্তর যুগে। দেশে তৈরী হয় আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের পরিস্থিতি। এসকল লোম হর্ষক ঘটনার বেশীর ভাগেরই দায় চাপে বিএনপির ওপর। তাদের এহেন কর্ম-কান্ড দেখে হতবাগ দেশের সাধারণ মানুষ । ফলে শেয়ার বাজারের দর পতনের ন্যায় মূহুর্তেই জনসমর্থনে ধ্বস নামে বিএনপির রাজণীতিতে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল গুলো বেড়িয়ে পরে রাজণীতির খোলা মাঠে। তবে বিএনপি যেমন স্ট্যান্ডবাজী কিংবা চাঁদাবাজীর তকমা গায়ে মেখে সমর্থন হারাচ্ছেন অন্যরা কিন্তু তা নয়। বরং অন্যরা এগিয়েছেন জণসমর্থনের দিকেই। কারন এ দেশের রাজণীতির মাঠের বড় দুই দলের শাসনই মানুষ দেখেছে প্রাণ ভরে। দেখেছে ফ্যাসিষ্ট সরকার পতনের পর কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের তান্ডবও।
এ নিয়ে কথা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কথা বলছেন বিজ্ঞ রাজণীতিকগণও। তবে এ নিয়ে নিজ দলের সমালোচনা করতে গিয়ে বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ সাবেক স্ব-রাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী যা বলেছেন তা যথার্থই বটে । সম্প্রতি বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা তার নিজ জেলা শহরের বাসভবনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে বলেন যে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জামায়াতের লোক। বিভিন্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের বিচারক যারা হচ্ছে, তারা জামায়াতের লোক। আর আমরা কী করছি? লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট দখল করছি। আজ রাজণীতির এই পরিস্থিতিতে দাড়িয়ে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সেই বক্তব্য যথার্থ বলেই মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাইতো ঠিক এই মূহুর্র্তে জটিল সমীকরণে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের রাজনীতি। কারন আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগের অংশ গ্রহণের সুযোগ ক্ষীণ। কিন্তু ঐতিহ্যগত প্রতিদ্ব›দ্বীর অনুপস্থিতি বিএনপিকে আদৌ কোন সুবিধা দেবে কিনা, তা এখন বড় মাপের প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় দৃশ্যপটে নেই চির প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগ। ভোট ও মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি এখনো অপ্রতিদ্ব›দ্বী অবস্থানে থাকলেও আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে এক সময়ের চারদলীয় জোটের অন্যতম শরিক ও মিত্রদল জামায়াতে ইসলামী। তারা নির্বাচনি জোটগঠন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা কৌশল গ্রহণের পরিকল্পনাকে বুদ্ধিবৃত্তির খেলা বলে মনে করছেন। ফলে এক সময়ের মিত্র এখন ভিন্ন ভূমিকায়। বিপরীতে জামায়াতের এই চ্যালেঞ্জকে সাদরে গ্রহণ করছে বিএনপি। তারাও তাদের নির্বাচনী কৌশল হাতে নিচ্ছে নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে। যে কারনে আগামী নির্বাচন হবে সবচেয়ে কঠিন নির্বাচন। এই নির্বাচনে জিততে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের কাছে থাকতে হবে এবং জনগণকে সঙ্গে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ বিহীন মাঠে পরিকল্পিত ভাবে জামায়াতে ইসলামী এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বিএনপিকে ঠেকাতে ইসলামী আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি এবং গণ-অধিকার পরিষদকে নিয়ে জোট বাঁধার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তারা। তাছাড়া ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন কি বাংলাদেশের ঢাকা ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের জয় দেশের ছাত্র রাজনীতি শুধু নয়, জাতীয় রাজনীতির জন্যও শিক্ষণীয়। ডাকসুকে বলা হয় মিনি পার্লামেন্ট। আগামী ফেব্রæয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিনি পার্লামেন্টের ফলা ফল কতটা প্রভাব বিস্তার করবে তা এখন দেশজুড়ে আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একথা অতিশয় সত্য যে, ’২৪শের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক আচরন নিয়ে কেবল রাজনৈতিক বোদ্ধারা নয় চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হিসেব কষছেন একদম তৃণমূলের জনসাধারনও। সুতরাং এখন সমস্ত অভিযোগ থেকে বেড়িয়ে বিএনপির উচিত আত্মসমালোচনা করা। জণসমর্থনের এ হেন পরিস্থিতিতে দলীয় সকল কার্যক্রমের ময়নাতদন্ত করে আসল কারণ উদঘাটন করা। কারন এই ফল দেখে কিছু মানুষ এ কারণে খুশি যে কয়েক দশক পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দলের একচেটিয়া আধিপত্য শেষ হয়ে গেল। তবে শিবিরের জয়ে যাঁরা আনন্দিত, তাঁদের সবাই যে জামায়াতের সমর্থক, তা নয়। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে একটা মৌলিক পরিবর্তন আসায় আনন্দিত। এখন আবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সদ্য সমাপ্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে (জাকসু) শিবির-সমর্থক ছাত্রদের জয়। এখন প্রশ্ন হলো, ডাকসু ও জাকসুতে জামায়াত-সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের জয় কি আগামী সাধারণ নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে? জামায়াতে ইসলামী কি এত দিন প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে থেকে জনমনে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে যে অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে মানুষ তাদের বেছে নেবে? কারন শুধু একটি ধর্মীয় আদর্শে দীক্ষিত এবং সৎ নেতা হিসেবে প্রচারিত পরিচয়ে একটি জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়া কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে জয়ী হওয়া আর দেশের সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনের অধিকাংশে জয়ী হওয়া এক ব্যাপার নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের জয়ের মধ্যে দেশের সাধারণ নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা দেখাকে অতিকল্পনা বলা যেতে পারে। তবুও বিএনপির মতো বড় দল এখন আর জামায়াতের শক্তিকে খাটো দেখবে বলে মনে হয় না। তারা এখন নিশ্চয়ই হিসাব-নিকাশ করেই জামায়াতকে মোকাবিলার কৌশল নেবে। বোঝা যাচ্ছে, সামনের জাতীয় নির্বাচনে ডাকসুর ফলাফল প্রভাব হতে পারে নানামুখী। কাজেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মতো অল্প কম্পনে বিএনপি যদি বড় ধরনের ভূকম্পনের আগাম সতর্কবার্তা বুঝতে পারে, তাহলে তা হবে বিএনপির জন্যই মঙ্গল। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের বার্তা বিএনপি নেতা-কর্মীরা অনুধাবন করতে না পারলে বৈরী শক্তির স্রোতে বিলীন হয়ে যাবে জাতীয়তাবাদী শক্তির একমাত্র ঠিকানা। আমরা জানি, ’২৪এর গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডাকসুর ফলাফল অন্তত বিএনপি ও জামায়াতের কৌশল ও চিন্তা-ভাবনায় কতটা পরিবর্তন আনে সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারন এই দল দুটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের যে কোনো পরিবর্তন সামগ্রিক রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে পরিবর্তন ঘটাবে। আমাদের অবশ্যই এ কথা ভুলে গেলে চলবে যে, গায়ের জোড়ের তুলায় বুদ্ধির জোড়ই কিন্তু শক্তিশালী হয়। সুতরাং সবশেষে আমরা এ কথাই বলবো যে,নহে আশরাফ যার আছে শুধু বংশের পরিচয়,সে-ই আশরাফ যাহার জীবন পূণ্য কর্ম ময়। এ মর্ম-বাণী যেন আমরা সকল ক্ষেত্রেই উপলব্দি করি এবং মেনে চলার চেষ্টা করি তবেই হতে পারবো সফল। সেটা রাজণীতির ক্ষেত্রেই হোক কিংবা জীবনের যে কোন ক্ষেত্রেই হোকনা কেন।
লেখক-বার্তা সম্পাদক : দৈনিক আমাদের কণ্ঠ