ইউনূস সরকারের একবছর : প্রত্যাশা-প্রাপ্তিতে হতাশ সাধারণ মানুষ

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

মো.ইউসুফ আলী

ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গত বছরের ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার । গতকাল ৮ আগষ্ট শুক্রবার পুরন হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সেই অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি। এই এক বছরে মানুষের প্রত্যাশা কতোটা পূরণ করতে পেরেছে সরকার। কতোটা পূরণ করতে পেরেছে দেশের মানুষকে দেয়া প্রতিশ্রæতি। গত দুদিন ধরে এই হিসাব-নিকাশই চলছে সর্বত্র। এক বছরে অনেক ভালো উদ্যোগ ছিল সরকারের। কিছু উদ্যোগ সফলও হয়েছে। কিছু কাজ মানুষের প্রশংসাও কুড়িয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলা, আর নজিরবিহীন মব সন্ত্রাস ঢেকে দিয়েছে সরকারের এসব সাফল্যকে। এক বছরের মাথায় নানামুখী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে। সরকারের ব্যর্থতা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী উদ্যোগ না থাকায় হতাশ সাধারণ মানুষ। অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া সাধারণ ছাত্র-জনতাসহ অন্যান্য পক্ষও সরকারের আমলনামা নিয়ে নাখোশ। কর্তৃত্ববাদী সরকার বিদায় নেওয়ার পর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, সে কথা আমরা বলছি না। তবে যে মাত্রায় পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল,সেটা হয়নি। রাষ্ট্রের এক চরম সন্ধিক্ষণে ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারের নানা উদ্যোগে নিত্যপণ্যের বাজারে অনেকটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। অস্থিরতা কমেছে বিদেশি মুদ্রার বাজারে । ফলে তলানিতে থাকা বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এখন অনেকটা স্বস্তির জায়গায়। কিন্তু এমন সব স্বস্তির খবরও ঢাকা পড়েছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম বিশৃঙ্খলা ও নজিরবিহীন মবের ঘটনায়। এসব ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সকল আকাঙ্খাকে। দারুণভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে অভ্যুত্থানে জীবন দেয়া হাজারো মানুষের ত্যাগের প্রতি সংশি¬ষ্টদের দায়বোধকে । তাইতো অন্তর্বর্তী সরকারের বর্ষপূর্তী নিয়ে নানান কথা বলেছেন বিশিষ্টজনরা। কথা বলছেন একেবারে তৃণমূলের সাধারণ মানুষ। কথা বলেছেন বিভিন্ন সংগঠনও। এরমধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল বাংলাদেশ-(টিআইবি) ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)উল্লেখযোগ্য।এছাড়া কথা বলেছেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্তাব্যক্তিগণও। টিআইবি একদিকে যেমন সরকারের এক বছরের মূল্যায়নে বলেছে, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সত্তে¡ও কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের পর এক বছরে বিচার, সংস্কার, নির্বাচন প্রস্তুতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উলে¬খযোগ্য অগ্রগতির কথা বলেছেন। অন্যদিকে আবার অপ্রাপ্তি বিশেষ করে একদিকে আইনের শাসন ও স্বচ্ছতার ঘাটতি, স্বার্থের দ্ব›দ্ব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের একাংশের দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য, গ্রেফতার ও জামিন বাণিজ্যের কথাও বলছেন। টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে বলেছেন,গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে মব তৈরি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাংবাদিক, লেখক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা অব্যাহত থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন। কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে টিআইবি এসব কথা বলেন। অপরদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র আসক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, গত বছর দেশ একটি যুগান্তকারী গণজাগরণের সাক্ষী হয়। এই আন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং এটি ছিল একটি নতুন যুগের সূচনা। যেখানে মানুষের অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে গড়ে ওঠে বিস্তৃত গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আন্দোলনের পরে অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণে হতাশ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র আরো বলছেন যে, দেশে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক প্ররোচনা কিংবা সামাজিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত এসব সহিংস কর্মকান্ডে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানসমূহ এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যা মানবাধিকারের জন্য এক গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরে কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন, হতাশা থাকলেও অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে ৫ই আগস্ট জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ফেব্রæয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষের মাঝেও।এই সময়ে নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে ইতিমধ্যে চিঠি দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। এরই প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। শত হতাশা-অপ্রাপ্তির মধ্যেও সরকারের বর্ষপূর্তির সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করায় কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে জনমনে। অনেকে মনে করছেন অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে অনেক ক্ষেত্রে স্থবিরতা কেটে যাবে। অনেকটা সুগম হবে মানুষের আশা-আকাঙ্খা পূরণের পথ ।
এদিকে সরকারের বছরপূর্তিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ১২টি সফলতার কথা তুলে ধরেছেন। সেগুলো হচ্ছে-শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জুলাই সনদ, জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার, নির্বাচন পরিকল্পনা ও সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ইন্টারনেট অধিকার, পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন, প্রবাসী ও শ্রমিক অধিকার, শহীদ ও আহত বিপ্ল¬বীদের সহায়তা এবং সামুদ্রিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এতে প্রেস সচিব বলেন, জুলাই বিপ্ল¬বের পর দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরেছে, যার ফলে নৈরাজ্য ও প্রতিশোধের চক্র বন্ধ হয়েছে। ধ্বংস প্রাপ্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রেখেছে এই সরকার। খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে অর্ধেকে নামানো হয়েছে। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮.৪৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে (যা ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন)। বহু বছর পর টাকার মান ডলারের বিপরীতে বেড়েছে এবং ব্যাংক খাত স্থিতিশীল হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সফল শুল্ক আলোচনা হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, দুর্বল সরকার এটি পারবে না। কিন্তু এই সরকার সেটি করে দেখিয়েছে। তবে এ দেশের সকল শ্রেনি-পেশার মানুষের মনে এমন একটি ধারনা জন্মেছিল যে, যেহেতু প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মানুষ এবং অত্যন্ত ভদ্রচিত মানুষ সুতরাং অন্তত তার শাসনামলটুকুতে দেশবাসী যথেষ্ঠ ভালো থাকবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্য যে, আন্দোলনের পরে অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের সে আশা-প্রত্যাশা পূরণে হতাশ করেছে। কারন গত বছরের ৫ আগষ্ট ফ্যাসিষ্ট সরকার বিদায় নিলেও দেশজুড়ে খুন, জখম, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি লেগেই রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার বোধ আতঙ্কিত করে তুলছে দেশবাসীকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সব অপচক্র ভাঙায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী কালিন সরকার। এসবে ইতোমধ্যে স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন অনেকে। জুলাই বিপ্লবে যে নতুন বাংলাদেশ সৃজনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল- তা হাতছাড়া হওয়ার হতাশা প্রকাশ করছেন অনেকে। বিশেষ করে একদিকে নজিরবিহীন মবের ঘটনা। অপরদিকে আবার আইনের শাসন ও স্বচ্ছতার ঘাটতি, স্বার্থের দ্ব›দ্ব, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের একাংশের দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য, গ্রেফতার ও জামিন বাণিজ্য সরকারের সকল অর্জনকে ঢেকে দিয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে যেটুকু সময় পাওয়া যায় সে সময়ে সরকার গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক চেষ্টা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন দেশের সাধারন জনগণ। # লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মো.ইউসুফ আলী
মোবাইল-০১৭১৬-১০০৯৯৪
ই-মেইল- bdeusuf07@gmail.com

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ

বিজ্ঞাপন