নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
নারয়নগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল,ধনকুন্ডা,জালকুড়ি মোট তিনটি মৌজা নিয়ে পরিচালনা করা হয় গোদনাইল ভূমি অফিসের কার্যক্রম । নারায়ণগঞ্জ ডেমরা সড়কের পশ্চিম পাশে ২ নং ঢাকেশ্বরী টু জালকুড়ি সংযোগ সড়কের দক্ষিনে এই অফিসের অবস্থান। একজন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, একজন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা, দুইজন অফিস সহায়ক নিয়ে অফিসের কাঠামো গড়ে উঠলেও এই অফিস নিয়ন্ত্রণ করছে বহিরাগত দালালরা। অফিসের মূল ফটক থেকে শুরু করে রেকর্ড রুম পর্যন্ত রয়েছে দালালদের অবাধ যাতায়াত। দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে করতে হয় নামজারিসহ ভূমি সংশ্লিষ্ট সকল কাজ। যে কারণে গোদনাইল ভুমি অফিসটি পরিণত হয়েছে অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় । এই অফিসে ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয় না। সেবা নিতে সেখানে পদে পদে ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ঘুষ না দিলে ফাইলই ধরেন না অথবা ভুল রিপোর্ট দিয়ে হয়রানী করা হয় সেবাপ্রার্থীদের।
জানা যায়,নারায়ণগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের গোদনাইল ইউনিয়ন ভুমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে ঘুষ বাণিজ্য। অফিসের ভেতরে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রতিবাদ করলে বা ঘুষ দিতে না চাইলে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে নামজারী করতে ও সরকারকে খাজনা দিতে বাধার সৃষ্টি করা হয়।
তিনি রীতি মতো শতাংশ প্রতি পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার টাকা রেট নির্ধারণ করে ঘুষ নেন বলে জোরালো অভিযোগ এবং প্রমান পাওয়া গেছে। কখনো কখনো কাগজপত্রে কোন ঝামেলা থাকলে ইচ্ছে মত মোটা অংকের টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,ঘুষ না পেলে কোন ফাইলে সই করেন না তিনি। শুধু তাই নয়, একজনের জমি আরেকজনকে খারিজ দিয়ে ঝামেলা লাগান এবং সংশোধনের নামে আবারও মোটা অংকের টাকা দাবি করে থাকেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে ,নারায়ণগঞ্জের সোনাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে থাকাকালীন সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে দাপটের সাথে শামীম ওসমানের ছত্রছায়ায় থেকে সাধারণ মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিজেকে আওয়ামী লীগের লোক পরিচয় দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেকর্ড রুমে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ সেখানে তার নিয়োগকৃত দালাল কাগজপত্র নিয়ে ভলিউম হাতাহাতি করছেন তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি নায়েব সাহেবের লোক। সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন গোদনাইল,ধনকুন্ডা,জালকুড়ি মৌজার বাসিন্দারা জিম্মি হয়ে আছে এই ভুমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা তথা নায়েব দুলাল চন্দ্র দেবনাথের কাছে। তিনি এই অফিসে যোগদান করার পর থেকে দুর্ণীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে গোদনাইল ইউনিয়ন ভুমি অফিস। নামজারী করার জন্য সরকারী ফি ১১’শ টাকা নির্ধারিত থাকলেও এর বাইরে তিনি নিজের মতো করে ফি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই অফিসে তিনি সর্বেসর্বা। প্রতিটি এলাকার সড়কের পাশের জমির নামজারি করতে হলে শতাংশ প্রতি ৫ হাজার এবং অন্যান্য যে কোনো জমির নামজারি করতে হলে শতাংশ প্রতি ২ হাজার টাকা তাকে দিতে হবে বলে নির্ধারণ করেছে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ। ঘুষ দিতে না চাইলে বা এর কম দিলে ভুল রিপোর্ট দিয়ে হয়রানী করার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু সরকারী কর্মকর্তা হওয়ায় মুখ খুলতে সাহস পায় না কেউ।
আরো জানা গেছে, এলাকা ভিত্তিক দালালও নিয়োগ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এদের মাধ্যমে জমির কাগজপত্রে এদিক সেদিক করে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন দুলাল চন্দ্র দেবনাথ। দুর্নীতি দমন কমিশন গোপন তদন্দ্র করলেই দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে বলে বের হবে মনে করেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল। দুর্নীতিবাজ ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে অর্থ আদায়কারী দুলাল চন্দ্র দেবনাথের প্রত্যাহার সহ তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জোর দাবী জানান ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের ভুমি অফিসের এক কর্মচারী বলেন, এমন দুর্নীতিবাজ অফিসার আমি জীবনেও দেখি নাই। সকালে অফিসে এসেই টাকা টাকা করে। কয়টা নামজারির আবেদন জমা পড়ছে, সেই খবর নিয়ে হিসেব করতে বসে, কোনটা থেকে কতো টাকা নিবে? টাকা ছাড়া ফাইলই দেখেন না। আগে বলে, টাকা কতো আছে সেটা বলো।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জের এসিল্যান্ডের সিনিয়র এক কর্মকর্তা বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলায় মোট ৪৩টি ইউনিয়ন ভুমি অফিস আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর তিনজনের মধ্যে ১ নম্বর হচ্ছে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ। তার নামে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগও আছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। এছাড়া নাম প্রকাশে ভূমি কর্মকর্তারা জানান এই দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দূদক তদন্ত চালালে চাঞ্চ্যল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে তারা মনে করেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় অভিযুক্ত দুলাল চন্দ্র দেবনাথের সাথে। অভিযোগ শুনেই তিনি সাংবাদিকের সাথে অশোভন আচরণ করেন, পরবর্তীতে এসব অনিয়ম দুর্নীতির ফুটেজ রয়েছে জানতে পেরে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে প্রস্তাব দেন।
এব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ সার্কেলের সহকারি কমিশনার(ভুমি) দেবযানী করের সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেন নি। বরং এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে সরাসরি জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনের পরামর্শ দিয়ে ফোন রেখে দেন।