পিরোজপুর প্রতিনিধি:
পিরোজপুর শহর থেকে ৪৩ কিলোমিটার দ‚রে, নাজিরপুরের বেলুয়া নদীর মোহনায়, প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই এক অন্যরকম জীবন জেগে ওঠে। শত শত নৌকা আর ট্রলারে ভরে যায় নদী, যা পরিণত হয় এক বিশাল বাজারে। এখানে কোনো দোকান নেই, নেই কোনো ইটের দেয়াল। প্রতিটি নৌকা বা ট্রলারই এক একটি ভাসমান দোকান। চাষিরা সরাসরি তাদের খেত থেকে তাজা সবজি, ফল, ধান, চাল, এমনকি গাছের চারা নিয়ে আসেন। আর পাইকাররা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসেন পণ্য কিনতে। শত শত নৌকা আর ট্রলারে করে আসা ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্রে, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য বেচা-কেনা হয়।
এই ভাসমান বাজারটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম ভাসমান বাজার। দুই শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই বাজারটি একাধারে কৃষিপণ্য বিক্রির কেন্দ্র এবং এলাকার মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর এক অনন্য মাধ্যম।
এ অঞ্চলে কোনো রাস্তাঘাট না থাকায় প্রায় ২০০ বছর আগে বেলুয়া খালে নৌকায় করে পণ্য কেনা-বেচার মাধ্যমে এই বাজারের স‚চনা হয়েছিল। বর্তমানে বাজারটি প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এটি সম্প‚র্ণভাবে নদীর ওপর অবস্থিত। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এই বাজারে কেনা-বেচা চলে, যেখানে শত শত নৌকা ও ট্রলারে করে আশেপাশের ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের কৃষক ও পাইকাররা আসেন। সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজার জমজমাট থাকলেও, কখনো কখনো পাইকারি বেচাকেনা বিকেল ৪টা পর্যন্তও চলে।
বৈঠাকাটা বাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর কেনা-বেচার ধরন। চাষিরা ছোট নৌকায় করে সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসেন এবং পাইকারদের বঙ ট্রলারে পণ্য সরবরাহ করেন। এখানে একটি নৌকা বা ট্রলারই এক একটি ভাসমান দোকান। এই বাজারে শাক-সবজি, ফল, ধান, চাল, নারকেল, সুপারিসহ বিভিন্ন ধরনের গাছের চারাও বিক্রি হয়।
এখানে পানিতে জন্মানো কচুরিপানা ও শেওলাও বিক্রি হয়, যা ভাসমান ধাপ তৈরি করে চারা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এটি স্থানীয় কৃষির এক বিশেষ কৌশল। এই বাজার থেকে কৃষিপণ্য সরাসরি ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশের বাইরেও রপ্তানি হয়।
বর্তমানে এই বাজারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সঙক যোগাযোগের অভাব। পদ্মা সেতু হওয়ার পর ঢাকা-বৈঠাকাটা রুটের ব্যস্ততা কমে গেছে, যা পাইকারদের খরচ বাড়িয়েছে। এছাড়া, নদীর কিছু অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং বাজারে জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা বা ফায়ার সার্ভিসের সাবস্টেশন নেই। স্থানীয় বাসিন্দা ও বাজার ইজারাদাররা বাজারের পাশে একটি ভালো সঙক এবং বেলুয়া নদীর ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন, যা এই ঐতিহ্যবাহী বাজারকে আরও সচল করবে এবং এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: জাতীয় সংবাদ, দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, বিশেষ সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম