দেশজুড়ে নৃশংসতা-কেন এই মানসিক বিপর্যস্ততা; কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এ জাতি?

দেশজুড়ে নৃশংসতা-কেন এই মানসিক বিপর্যস্ততা; কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এ জাতি?
দেশজুড়ে নৃশংসতা-কেন এই মানসিক বিপর্যস্ততা; কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এ জাতি?
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

 

মো.ইউসুফ আলী

গতবছরের জুলাই আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া নৃশংসতা ও মব ভায়োলেন্স যেন থামছেইনা। এ যেন দিনকে দিন বেড়েই চলছে নিয়ন্ত্রহীন ভাবে। আজকাল পত্রিকার পাতা উল্টালে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখতেই যেন নজরে ভেসে ওঠে নিয়ন্ত্রনহীন এসব মব ভায়োলেন্সের কোন না কোন চিত্র। যা দেখে আৎকে ওঠে দেশের সাধারণ মানুষের সহজ সরল মন। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীদের এমনসব দৃশ্য যেন চোখকে ছানাবড়ায় পরিনত করে তোলে। এসব মবস ন্ত্রাসীদের বিভৎস সব কর্মকান্ড যেন সহ্য করার মত নয়।  কিন্তু কেন এই নৃশংসতা! কেনইবা এই মানসিক বিপর্যস্ততা এ নিয়ে জনমনে  প্রশ্নের শেষ নেই। এর মাধ্যমে কি সন্ত্রসীরা তাদের ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে ? নাকি এভাবে একের পর এক নৃশংস কর্মকান্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল বানিয়ে রেখে রাজনৈতিক কোন ফায়দা আদায় করতে চাচ্ছে তৃতীয় কোন পক্ষ! অপরাধ বিশ্লেষকদের এমন মন্তব্যকেও একেবারে অহেতুক বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

জুলাই গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার যে হত্যাকান্ড চালিয়েছে সেই ট্রমাই মানুষ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে আবার এমন হত্যাকান্ড,খুন ও ধর্ষনের মত নারকীয় যতসব কর্মকান্ড দিনের পর দিন দেশের কোথাও না কোথাও ঘটেই চলছে। মব চক্রের এসব কর্মকান্ড আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? এই মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে এই জাতি কোথায়  গিয়ে দাঁড়াবে?

দেশী বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজকাল আমরা যে কত রকম অপরাধ মূলক কর্মকান্ডের খবর প্রকাশিত হতে দেখতে পাচ্ছি তার কোন ইয়ত্বা নাই। আমরা হরহামেশাই দেখতে পাচ্ছি যে,ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিভেদ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম কত কারণে অকারনেইতো আজকাল মানুষ খুন হচ্ছে। মানুষকে খুন করায় মানুষের মধ্যে কোনো দ্বিধাও কাজ করছে না! তবে এসব কর্মকান্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ উঠলেও সরকার কিংবা সরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোন ভুমিকা দেখতে পাচ্ছে না দেশবাসী। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার কী করছে? কোনো ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক ছুটে যেতে দেখছে না প্রশাসনকে। ফলে ”এ নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা একেবারেই অহেতুক নয় যে, থানা—পুলিশ কোথায়? সরকারের ব্যক্তিবর্গ কোথায়? এক বছরেও কেন দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা? দেশের মানুষকে এইভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য ছেড়ে দিয়ে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তারা?”  গতবছরের ৫ আগষ্টের পর থেকে সারা দেশে যেভাবে একের পর এক মব ভায়োলেন্স ঘটেই চলছে তারই ধারাবাহিকতার লুপ প্রকাশ পেয়ছে ‘৯ জুলাই বুধবার। ওইদিন  বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে মো. সোহাগ নামের এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীকে মাথায় পাথর মেরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই দিন পর শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই হত্যাকান্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে।যা তোলপার করেছে পুরো নেট দুনিয়াকে। ফলে এ হত্যাকান্ডটি আজ পরিনত হয়েছে টক অব দ্যা কান্ট্রিতে।

হত্যাকান্ডের ভিডিও ফুটেজটি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পরার পর কারও অস্বীকার করার সুযোগ নেইযে, এটি কোনো ‘স্বাভাবিক হত্যাকান্ড’ ছিল না। এ নিয়ে লোকমুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে যে,এটা ছিল ভয়ংকর এক মৃত্যু। এটা ছিল বর্বরোচিত এক হত্যাকান্ড। কারন এ ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা গেছে যে, এ হত্যাকান্ডে জড়িতরা  সোহাগকে শুধু উলঙ্গই করেনি, তারা সোহাগের  লাশের ওপর নৃত্য করে আনন্দ—উল্লাসও করেছে।’ঢাকার জনবহুল একটা এলাকায় এক রকম উল্লাস করে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে ওই ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। পিটিয়ে,কুপিয়ে, নির্যাতন করে পরনের কাপড় খুলে ফেলে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় ওই ব্যবসায়ীকে। এরপর বড় একটা পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে মাথা থেঁতলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতক। এই দৃশ্য কি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায়? তাইতো সোহাগ হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সারা দেশ।

শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), এছাড়া ঢাকা চট্টগ্রাম,রাজশাহী,খুলনা,রংপুর ও জগন্নাথবিশ্ববিদ্যালয়সহ, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র—জনতা। এসব বিক্ষোভে হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবি করা হয়েছে। অপরদিকে সোহাগ হত্যাকে আইয়ামে জাহেলিয়াতের সাথে তুলনা করে এ হত্যার নিন্দা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে মাথায় পাথর মেরে শত শত মানুষের সামনে এই হত্যার ঘটনা জাহেলিয়াতের লোমহর্ষক নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতাকেই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেন পাশবিক এই হত্যার ঘটনায় মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এভাবে পাশবিক কায়দায় মানুষ হত্যা সভ্য সমাজে বিরল। শুক্রবার এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এ ঘটনায় আবার সেই পতিত ফ্যাসিবাদেরই পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে মন্তব্য করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘সরকারকে এই সব দুর্বৃত্তদের শক্ত হাতে দমন করতে হবে এবং দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’

এছাড়া খুলনার দৌলতপুরে  শুক্রবার আরেক হত্যাকান্ড ঘটেছে। সেখানে থানা যুবদলের সাবেক এক নেতাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত সাবেক যুবদল নেতা কয়েক মাস আগে নিজেই রামদা হাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।  তাছাড়া আরেকটি হত্যাকান্ড আমাদের হতবাক করে দেয়। চাঁদপুরে জুমার নামাজের পর এক ইমাম ও খতিবকে মসজিদের ভেতরেই কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছেন এক ব্যক্তি। খতিব সাহেব স্থানীয়ভাবে স্বনামধন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। এসব ঘটনায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দরা বলেছেন যে, ‘দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রশাসন কোথাও অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। রাজধানীসহ দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কারা অপরাধ করছে, রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে অবিলম্বে তাদের গ্রেফতারের দাবিও জানান তারা। তা না হলে সরকারকে আবারও নতুন করে জনরোষের মুখোমুখি হতে হবে।’  তাই অবিলম্বে সারা দেশে কম্বাইন্ড (সমন্বিত) অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজদের গ্রেফতার করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার দাবি জানান নেতারা।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

 

 

 

 

 

 

 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ