মো.ইউসুফ আলী
পাথর প্রকৃতির উপহার। সেটা সাদা হউক বা কালোই হোক। কিংবা অন্য যে কোন রংয়েরই হোক না কেন। পাথর দুনিয়াবাসীর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার এক অপার নেয়ামত। ইহা সৃষ্টি বা বিনাসে মানুষের কোন হাত নেই। তবে মানুষের হাতের ছোয়ায় ইহা স্থানান্তর যোগ্য বটে। আবার আমাদের কালো হাতের ছোয়ায় ইহা বিনষ্টও হয় বটে। যেভাবে বিনষ্ট হতে চলেছে সিলেটের ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য মন্ডিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। যেখানে সাদা পাথরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিনিয়তই ছুটে যেত হাজার হাজার প্রকৃতি প্রেমী মানুষ। কিন্তু আমাদের মানুষরূপী কিছু অমানুষের কালো হাতের ছোবলে যে পর্যটন কেন্দ্রটি আজ পরিনত হয়েছে শুধুই বিরান ভুমিতে। সাদা পাথর নিয়ে আমাদের ইসলামে একটি জীবন্ত নিদর্শণও রয়েছে। আমরা যদি ইসলামের ইতিহাস সেরা সেই নিদর্শণটির দিকে তাকাই তাহলে কি দেখতে পাই ? সেখানেও আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে, আমাদের পাপিষ্ট কালো হাতের ছোয়ায় সাদা থেকে কালোয় পরিনত হয়েছে পাথর (আল-হাজর আল-আসওয়াদ)। মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতি ও ইবাদতের প্রধান কেন্দ্র পবিত্র কাবা ঘর। এই ঘরের দেয়ালেই বিশেষভাবে স্থাপন করা রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ একটি পাথর। যার নাম ‘হাজরে আসওয়াদ’। আরবি ‘হাজর’ শব্দের অর্থ পাথর আর ‘আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ কালো। ‘হাজরে আসওয়াদ’-এর অর্থ হলো কালো পাথর। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হাজিরা তাওয়াফ করার সময় এতে সরাসরি বা ইশারার মাধ্যমে চুম্বন দিয়ে থাকেন। রাসুলের হাদিসে ‘হাজরে আসওয়াদ’ একটি জান্নাতি পাথর। বিশুদ্ধ সূত্রে আবদুল্ল¬াহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল¬াহ (সা.) বলেছেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাতের পাথর। প্রথমে এটি দুধের চেয়েও অধিক সাদা ছিল। পরে মানুষের গুনাহ তাকে কালো করে দিয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস : ৮৭৮)।
অন্যদিকে, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরও কেবল একটি অর্থনৈতিক সম্পদ নয়,এটি ভূতাত্তি¡ক ও পরিবেশগত ঐতিহ্য এবং মহান আল্লাহ তায়ালার অপর একটি নিদর্শনও বটে। জাফলং, সাদাপাথর, বিছানাকান্দি, যাদুকাটা নদী এই পর্যটন স্পটগুলো একই ভৌগোলিক বেল্টে অবস্থিত। যা মেঘালয়-খাসিয়া পাহাড় শ্রেণির পাদদেশে অবস্থিত। তারমধ্যে”সাদাপাথর” বাংলাদেশের একটি স্থান, একসময় যেখানে সাদা পাথরের স্তুপে ভরপুরছিল, সেখানে এখন গভীর গর্ত, ঘোলাপানি ও ধ্বংসের চিহ্ন। যা দেখে মনেহবে, সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধের কোনোফ্রন্ট ছিল এই সাদাপাথর। অথচ মাত্র এক বছর আগেও এখানে বিরাজ করেছে নয়নাভিরাম দৃশ্য। সবুজ পাহাড়ের কোলে ¯্রােতস্বতী স্বচ্ছ জলের কল্লোল ধারা, কয়েক একর জায়গা জুড়ে বিশাল বিশাল পাথরের নিরবচ্ছিন্ন সারি কিংবা পাথুরে বিছানা, দূরে সারি সারি নৌকা, সারা দেশ থেকে ছুটে আসা নানা বয়সী পর্যটকের উচ্ছল জলকেলির সবই যেন আজ কেবলই স্মৃতি। সাদা পাথর এলাকাটি যেন আজ এক মৃত পুরী। যাঁরা নিজেদের বর্তমান সরকারের ক্ষমতার ঘোষিত কিংবা অঘোষিত অংশীদার ভাবছেন, পুলিশ, প্রশাসন‘ম্যানেজ’করছেন, তাঁরা সবাই মিলেমিশে এই হরিলুট ও ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়েছেন। পরিবেশ কর্মীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশি কার্যক্রমের ঘাটতির সুযোগে জেলার প্রতিটি কোয়ারিতে পাথর লুট শুরু হয়। এ সময় গোয়াইন ঘাটের জাফলং, বিছনাকান্দি, কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি, শাহ-আরেফিন টিলা, সংরক্ষিত বাংকার এলাকা ও উৎমাছড়া এবং কানাইঘাটের লোভাছড়া রপাথর লুট শুরু হয়। মূল ধারার গণমাধ্যম এ নিয়ে নিউজ করেছে। তবু সরকার ও প্রশাসনছিল নির্বাক। পরিবেশ কর্মীরা মনে করেন,এই ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান লুটপাট কারীদের আরো উৎসাহ দিয়েছে।
সা¤প্রতিক কালে, সাদাপাথর থেকে পাথর উত্তোলন এবং তা পাচারের কারণে এটি সংবাদের শিরোনাম হয়েছে বার বার। বিশেষভাবে, সাদা পাথর থেকে পাথর উত্তোলন এবং তা সরিয়ে ফেলার ঘটনা স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এই ঘটনার উপর আলোকপাত করেছে এবং এর পেছনের কারণ ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অনুসন্ধান, গণমাধ্যমের রিপোর্ট এবং স্থানীয় মানুষের অভিযোগে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে-এই লুটপাটের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা । কিন্তু দুঃখ জনক হলো,ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর এলাকায় গত কয়েক মাসধরে সংঘটিত গণলুট একদিকে যেমন পরিবেশ ও পর্যটনকে ধ্বংস করেছে,অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্নরূপ উন্মোচিত করেছে।
বিভিন্ন পক্ষ থেকে বহু বছর ধরে বলা হচ্ছে যে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি এবং নদীগুলোর দখল একটি গুরুতর সমস্যা, যা দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য্য এবং অর্থনীতিকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করছে। এছাড়া বনভূমি থেকে অবৈধভাবে কাঠ কাটা এবং বিক্রি করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে মেগা প্রকল্প গ্রহণ, জুমের জমি দখল, আদিবাসীদের জমি থেকে উচ্ছেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। পাশাপাশি এদেশের মানুষের এটা অবশ্যই অজানা কোন বিষয় নয় যে, এদেশে চোরা শিকারিরা গোপনে বাঘ, হরিণ শিকার করে। রাতের আঁধারে বন খেকোরা উজাড় করে করে বন । কিন্তু এবার তারা লুটপাট করছে দিন দুপুরে। তাতে আর কি আসে যায়। কারন যখন যারা ক্ষমতায় যায় তারাইতো সবাই লুটে-পুটে খায়। এবারওতো তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
আসলে আমেরিকান আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সেইবিখ্যাত উক্তিটি কি আমাদের কারো মনে আছে ? যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যেদিন পৃথিবীর শেষ বৃক্ষটি কেটে ফেলাহবে, ধরা হয়ে যাবে শেষ মাছটি, শেষ নদীটির জল দূষিত ও বিষাক্ত করে ফেলাহবে, শুধু সে দিনই মানুষ বুঝবে, টাকা খেয়ে বাঁচা যায়না। সভ্যতার ইমারতে দাঁড়িয়ে গৌরব করলেও আমরা সম্ভবত মানুষের সেই অকৃত্রিম সহজাত উপলব্ধি থেকে আজও অনেক দূরে। সীমাহীন লোভ ও লালসার কাছে আমাদের সব শুভবোধ, সৌন্দর্যবোধ আজ বিপন্ন।
তবে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর লুটের ঘটনা নিয়ে সবশেষ আশার কথা হলো এই যে,সাদা পাথর এলাকাকে আগের রূপে ফিরিয়ে দিতে সবকিছু করা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। গত বৃহস্পতিবার সকালে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন এক সময়ের বহুল আলোচিত নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সারওয়ার আলম। তারপর দুপুরেই ছুটে যান পাথর লুটের জন্য বহুল আলোচিত জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর এলাকায়। সেখানেই পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। পরে বিকালে ফেরার পথে তিনটি স্টোন ক্র্যাশার মিলে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু লুটের পাথর উদ্ধার করেন। এই মূহুর্তে তার মত একজন সৎ ও যোগ্য প্রশাসক সিলেটে যোগদান করা সিলেটের পরিবেশ রক্ষার জন্য অনেকটা আশার আলোর মতই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
আমরাও মনে করি,সিলেটে পাথর লুটের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদের একমাত্র পরিচয়, তারা অপরাধী, দেশের সম্পদ ধ্বংসকারী দেশদ্রোহী। এদের ক্ষমা নেই। যথাযথ তদন্ত পূর্বক দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তিই তাদের প্রাপ্য। সরকার এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা। সুতরাং আসুন, দেশের এই দু:সময়ে সময়ে দেশের গৌরবময় সব ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করি। আগলেরাখি। প্রাকৃতিকসম্পদ ও পর্যটন স্পটগুলো।
মো.ইউসুফ আলী
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক