নিজস্ব প্রতিবেদক
উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের টার্গেট করে ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের ফাঁদ পাতা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। গত ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে রাজধানীর তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবের কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৫৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই কর্মকর্তা ২০২৪ সালে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যান। ওই বছরের অক্টোবর মাসে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে তাকে মিরপুরের একটি কথিত প্রতিষ্ঠানে পরিচালক (অ্যাডমিন) পদে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি সেই ঠিকানায় গেলে চক্রের সদস্যরা তার জীবনবৃত্তান্ত যাচাই করে নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপর নভেম্বর মাসে তাকে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেখানে এক সপ্তাহের মধ্যে মূলধনের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার মৌখিক চুক্তি হয়। এই প্রলোভনে পড়ে ভুক্তভোগী অল্প দিনের ব্যবধানে ৫৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষে চক্রটি মুনাফা ও মূলধন তো ফেরত দেয়ইনি, উল্টো আরও অর্থ আদায়ের জন্য ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। প্রতারণার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে তিনি গত ৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে পল্লবী থানায় ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় একটি মামলা (নম্বর-১০) দায়ের করেন।
বাদীর দেওয়া তথ্যে আসামিদের বিস্তারিত পরিচয় না থাকলেও সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টের একটি চৌকশ দল প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আসামিদের শনাক্ত করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানাধীন দক্ষিণ হলোদিয়া এলাকার মৃত আব্দুল খালেক মোল্লা ও মৃতা মাবিয়া বেগমের ছেলে মো. তোফায়েল হোসেন ওরফে রতন (৬৮), বরিশালের মূলাদী থানাধীন শফিপুর এলাকার মো. আব্দুস রশিদ মুন্সী ও রেনু বেগমের ছেলে মো. লিটন মুন্সী (৬০), গাজীপুর সদরের টেককাথোরা এলাকার মৃত ফিরোজ মিয়া ও আনোয়ারা বেগমের ছেলে মো. বাবুল হোসেন (৫৫) এবং মিরপুর-১ এলাকার মো. আমির হোসেন ও জাহানারা বেগমের ছেলে মো. নুরুল ইসলাম (৩৯)। দিয়াবাড়িতে অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত নয়টি মোবাইল ফোন, ১২টি সিম কার্ড, পাঁচটি মানি রিসিপ্ট, দুটি ভিন্ন বিলের কাগজ এবং বেশ কিছু বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরা এলাকায় বিলাসবহুল অফিস ভাড়া নিয়ে উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিনিয়োগের নামে সর্বস্বান্ত করে আসছিল। আসামিদের মধ্যে তোফায়েল হোসেনের বিরুদ্ধে রমনা মডেল ও মোহাম্মদপুর থানায় এবং লিটন মুন্সীর বিরুদ্ধে মূলাদী থানায় একাধিক পূর্ববর্তী মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এই চক্রের পেছনে আরও কোনো প্রভাবশালী ইন্ধনদাতা রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটন করতে গ্রেপ্তারকৃতদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি অপরিচিত নম্বর থেকে আসা যেকোনো ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব এবং অজ্ঞাত প্রতিষ্ঠানে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে সিআইডি।